কালোজিরা খাওয়ার ১৫টি উপকারিতা

সুস্থ থাকতে কালোজিরাকে যুগ যুগ ধরে প্রাধান্য দিয়ে আসা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কালোজিরাতে প্রায় সকল প্রকার রোগের প্রতিকার পাওয়া যায়। তাই দেহের সুস্থতার বিবেচনায় প্রত্যেকেরই উচিত কালোজিরার উপকারিতা সম্পর্কে জানা ও কালোজিরা ব্যবহার করা। এতে জীবাণুনাশক উপাদানসহ রয়েছে ফসফরাস, কার্বোহাইড্রেট, লৌহ, ফসফেট, রয়েছে শক্তিশালী হরমোন ও ক্যান্সার প্রতিরোধক কেরোটিন।

কালোজিরার উপকারিতাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

১। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে কালোজিরার ব্যবহার

ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে কালোজিরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে ডায়বেটিস রোগীদের নতুন করে ঔষধ সেবনের প্রয়োজন হয় না এবং ডায়বেটিস রোগীরা উপকৃত হয়ে থাকেন। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে, কালোজিরা ব্লেন্ড করে নিতে হবে এবং দৈনিক ভোরে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানিতে ২-৩ চিমটি কালোজিরা গুড়ো মিশিয়ে পান করতে হবে।

২। স্মৃতিশক্তি বাড়াতে কালোজিরার ব্যবহার

দৈনন্দিন এটা ওটা কাজের চাপে ও ব্যস্ততায় আমাদের মস্তিষ্ক একঘেয়ে হয়ে যায় এবং একটা পর্যায়ে অনেক কিছুই আমরা ভুলতে শুরু করি বা মনে রাখতে পারি না। এই সমস্যার সমাধান হতে পারে কালোজিরা। ১ চামচ কালোজিরা গুড়োর সাথে ১ চামচ মধু মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে নাশতার আগে খেতে হবে। এতে করে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বাড়বে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পাবে।

৩। চুলপড়া রোধে কালোজিরার ব্যবহার

কালোজিরার উপকারিতা : চুলপড়া রোধে কালোজিরার ব্যবহার
Image by Pezibear from Pixabay

চুলপড়া বর্তমান জেনারেশনের একটি কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৈরি হয়েছে সমস্যার সমাধানে নানারকম উপায়ও। তবে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী সমাধানটি রয়েছে কালোজিরায়। প্রথমে একটি মাঝারি সাইজের লেবুর অর্ধেকটা নিয়ে রস বের করে নিন। এরপর লেবুর রসের সাথে যুক্ত করুন ৩-৪ চামচ লবণ।

লবণ ও লেবুর রস ভালোভাবে মেশানো হলে এটি সম্পূর্ণ মাথায় লাগান। আধঘন্টা রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে করে ময়লা জীবাণু ও খুশকি খুব সহজেই দূর হবে। চুল ভালোভাবে শুকানোর পর মাথায় কালোজিরার তেল লাগান। ২ দিন পর পর লেবু ও লবন সহযোগে মাথা ধুয়ে কালোজিরার তেল লাগান। এতে করে ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যেই চুল পরা কমবে।

আরও পড়ুন-

৪। লো ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কালোজিরার ব্যবহার

ঘুম থেকে উঠে ২-৩ কোয়া রসুন খেয়ে আধঘন্টা পর ১ চামচ কালোজিরার তেল ও ১ চামচ মধু মিশিয়ে খেয়ে নিলেই ব্লাড প্রেশার নিয়ে আর চিন্তিত থাকতে হবে না। এটি নিয়মিত খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্লাড প্রেশারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রতিদিন সম্ভব না হলে ২-১ দিন পর পরও খেতে পারেন।

৫। মাথা ব্যথা কমাতে কালোজিরা ব্যবহার করার পদ্ধতি

মাথা ব্যথা কমাতে কপালের দুই পাশে কালোজিরার তেল মালিশ করতে হবে ৫ মিনিটের মতো। এতে মাথা ব্যথা খুব সহজেই দূর হবে। এছাড়াও মাথা ব্যথা যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা আছে। বড়ি বানিয়ে খেলে মাথা ব্যথার উপদ্রপ হ্রাস পাবে এবং সাথে সাথেই ফলাফল পাবেন।

এর জন্য, ৪-৫ টুকরো আদা, ৩ মুঠো পুদিনাপাতা, ২ মুঠো কালোজিরা পিষে নিন। সাথে যুক্ত করুন ১ চা চামচ মধু। এবার এগুলো একত্রে মিশিয়ে হাত দিয়ে বড়ি বানিয়ে নিন। ৩-৪ দিন কড়া রোদে শুকালে বড়ি ২০-২৫ দিনের মতো রেখে খাওয়া যাবে। যখনই মাথা ব্যথা শুরু হবে ৩ টি বড়ি ও এক গ্লাস পানি খেয়ে নিবেন। ৫-১০ মিনিটের মধ্যে মাথা ব্যথা গায়েব হয়ে যাবে।

৬। হজমের সমস্যায় কালোজিরার উপকারিতা

এসিডিটি বা হজমের সমস্যায় এখন আর টাকা খরচ করে ঔষধ কিনতে হবে না। প্রতিকার রয়েছে ঘরে থাকা উপাদানে। কম বেশি আমাদের সবার ঘরেই কালোজিরা থাকে। এখন থেকে কালোজিরা ব্লেন্ড করে রাখবেন। হজমজনিত কোনো সমস্যা দেখা দিলেই এক গ্লাস গরম দুধে ২-৩ চামচ কালোজিরা গুড়ো মিশিয়ে পান করলে সাথে সাথেই উপকৃত হবেন। এছাড়াও ক্ষুধামন্দা সমস্যা থাকলে সেটাও দূর হবে।

৭। ত্বকের যত্নে কালোজিরার ব্যবহার

রোগে প্রতিকারের পাশাপাশি ত্বকের যত্নেও কালোজিরা পিছিয়ে নেই। কালোজিরাতে লিনোলেনিক ও লিনোনেইক নামক এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড রয়েছে, যা ত্বককে ক্ষতিকর ইউভি রশ্মি থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে।

ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে ১ চা চামচ কালোজিরার তেল, ১ চা চামচ মধু ও ১ চা চামচ অ্যালোভেরা জেল একত্রে মিশিয়ে দিনে ২ বার নিয়মিত ত্বকে ম্যাসাজ করুন। এর ফলে দ্রুত ত্বক উজ্জ্বল হবে।

ব্রণের সমস্যা সমাধানে কলোজিরার ব্যবহার – যদি আপনার ব্রণের সমস্যা থেকে থাকে তাহলে এটা ওটা ট্রাই না করে আপেল সাইডার ভিনেগারের সাথে কালোজিরার পেস্ট মিশিয়ে দিনে ২ বার ব্যবহার করুন। ৭ দিনের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করতে পারবেন।

আরও পড়ুন-

৮। রোগ প্রতিরোধে কালোজিরার উপকারিতা

ভেজাল মিশ্রিত দ্রবাদি খেয়ে মানুষ আজ নানাবিধ জটিল রোগে জর্জরিত। তাই দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করা অতি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালোজিরা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সম্পন্ন। নিয়মিত কালোজিরা খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও অঙ্গপ্রতঙ্গ সতেজ থাকে।

আধ চামচ কালোজিরার তেলের সাথে ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিয়মিত খেলে সাধারণ রোগের পাশাপাশি জটিল রোগ থেকেও বেঁচে থাকতে পারবেন। এছাড়াও খাবার তালিকায় নিয়মিত কালোজিরা ভর্তা রাখতে পারেন।

৯। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট রোগে কালোজিরার ব্যবহার

হাঁপানি রোগীদের জন্য কালোজিরা অত্যাবশকীয় উপাদান বলা চলে। কালোজিরা হাঁপানি দূর করতে সফল ভূমিকা পালন করে। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ১ চা চামচ কালোজিরার তেল, ১ গ্লাস দুধে মিশিয়ে নিয়মিত পান করুন। এছাড়াও খাবার তালিকায় কালোজিরা ভর্তা রাখুন।

১০। কিডনির সমস্যায় কালোজিরার উপকারিতা

কিডনির যেকোনো ধরনের রোগের প্রতিকার রয়েছে কালোজিরাতে। বিশেষ করে কিডনির পাথর সারাতে -২ চামচ কালোজিরা গুড়ো ও ২ চামচ বিশুদ্ধ মধু কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন ভোরে খেতে হবে। এছাড়াও অ্যাপেল সিডার ভিনেগারের অম্লিয় উপাদান পাথর সারায়।

মধুর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান কিডনির পাথর প্রতিরোধ করে। এক চা চামচ ভিনেগার, ২ চা চামচ মধু, ২ চা চামচ কালোজিরা তেল একত্রে মিশিয়ে টানা ৩০ দিন খেতে হবে। এতে কিডনির পাথর অপসারণ হওয়ার পাশাপাশি কিডনিসহ শরীরের যাবতীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

প্রাসঙ্গিক লেখাটি পড়ে নিন-

১১। চোখের সমস্যায় কালোজিরার ব্যবহার

চোখ ব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা ইত্যাদি সমস্যা দূর করবে কালোজিরা। চোখ ব্যথা করলে, চোখের পাতা, ভ্রুসহ, চোখের দুই পাশে কালোজিরার তেল মালিশ করতে হবে প্রতিদিন ঘুমানোর আগে। চোখে ঝাপসা দেখলে- গাজর ব্লেন্ড করে ১ কাপ পরিমাণ গাজরের জুস নিতে হবে এবং এতে ৩ চা চামচ কালোজিরা তেল মিশিয়ে খেতে হবে টানা একমাস ভোরে বা ঘুমোতে যাওয়ার আগে।

চোখ জ্বালাপোড়া করলে ২ টুকরো গাজর, ৪-৫ টুকরো শসা ও ৪ চা চামচ কালোজিরা ব্লেন্ড করে নিতে হবে। মিশ্রণের সাথে যোগ করতে হবে ২ চা চামচ মধু। নিয়মিত দিনে ২ বার খেলে চোখ জ্বালাপোড়া দূর হবে।

১২। হাঁটু ও পিঠের ব্যথা দূর করতে কালোজিরার ব্যবহারের উপকারিতা

বয়স্কদের হাঁটু ব্যথা, পিঠে ব্যথা নিত্যদিনের সঙ্গী। এর থেকে মুক্তি পেতে ব্যবহার করতে হবে কালোজিরা। ৩টি মাঝারি সাইজের আদা ও ৩-৪ টি মাঝারি সাইজের হলুদ থেতো করে, ১ চা কাপ শরিষার তেল, ২ চা কাপ নিম তেল ও ২ চা কাপ কালোজিরা তেলের সাথে ১০-১৫ মিনিটের মতো গরম করে নিতে হবে। তেলটি ঠান্ডা হওয়ার পর বোতলে সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যথার স্থানে তেলটি মালিশ করলে তৎক্ষনাৎ ব্যথা কমবে, এবং নিয়মিত ব্যবহারে দীর্ঘকালীন ব্যথা দূর হবে।

১৩। সর্দি-জ্বর সারাতে কালোজিরার উপকারিতা

লেবু চা বানিয়ে তাতে ২ চা চামচ কালোজিরা তেল মিশিয়ে সকাল বিকাল খেলে সর্দি-জ্বর দ্রুত কমবে। এছাড়াও ৩ কাপ পানিতে ১০-১২ টি তুলসিপাতা, ৪ চা চামচ লেবুর রস, ২ চা চামচ কালোজিরা তেল ও ১ চা চামচ মধু একত্রে ৫ মিনিট জ্বাল দিয়ে নিয়ে সকাল বিকাল খেলে একসপ্তাহের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি ইত্যাদি দূর হবে।

১৪। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কালোজিরার ব্যবহার

উচ্চরক্তচাপের মতো নিরবঘাতক থেকে বাঁচতে চাইলে কালোজিরাকে নিত্যদিনের সঙ্গী বানাতে হবে। যেমন- চা পানের অভ্যাস থাকলে চায়ের পানি গরম হওয়ার সময় ১চা চামচ কালোজিরা দিয়ে দিতে হবে অথবা চায়ের সাথে ১ চা চামচ কালোজিরা তেল মিশিয়ে নিতে হবে। খাবার তালিকায় কালোজিরা ভর্তা রাখুন। অথবা সকালে ঘুম থেকে উঠেই ২ চামচ কালোজিরা চিবিয়ে খেয়ে নিতে পারেন। আসল কথা হলো, যাদের হাই ব্লাড প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ আছে তারা কোনোভাবেই কালোজিরাকে অবহেলা করবেন না।

১৫। মেদ কমাতে কালোজিরার কার্যকারিতা

যারা মেদ কমাতে চান বা ফিট থাকতে চান তাদের জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে- ২ চা চামচ মধু ও ২ চামচ কালোজিরা তেল কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পান করা। এতে করে অতিরিক্ত মেদ দূর হবে, এবং থাকবেন শারীরিকভাবে ফিট ও এক্টিভ।

প্রাসঙ্গিক লেখা-