অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় – ৫টি কার্যকর টিপস

অতিরিক্ত ঘুম তাড়ানোর সহজ ৫টি উপায়

পড়তে বসলেই ঘুম? সত্যিকার অর্থে পড়ার সাথে ঘুমের কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, পড়ার নাম শুনলেই ঘুম চলে আসবে বিষয়টা মোটেই সেরকম না। তবুও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীরা টেবিলে বসে ঝিমোয় কেনো? বা, পড়তে বসলে রাজ্যের ঘুম তাদের চোখে এসে জড়ো হয় কেনো? আজকের আলোচনায় এই অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে খুবই কার্যকর ৫টি কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

পর্যালোচনা করলে এর অনেকগুলো কারণ বেরিয়ে আসে। সেগুলোর কিছু তুলে ধরা হলো-

পড়তে বসলে অতিরিক্ত ঘুম আসার কারণ

রাতে বেশি খাওয়া। সারাদিন পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থেকে যখন রাতে অধিক খাবার গ্রহন করেন, তখন স্বভবতই শরীর একটু বিশ্রাম চায়। তখন পড়তে বসলে ঘুমোতে ইচ্ছে করবে এটাই স্বাভাবিক।

বই পড়ার সময় চোখ এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে এবং চোখকে অবিরত ডানে বামে ঘোরাতে হয়। ফলে চোখের পেশিগুলো হয়ে উঠে ক্লান্ত। তাছাড়াও পঠিত বিষয়গুলো বুঝতে হয়। ভবিষ্যতের জন্য আয়ত্ত করতে হয়। এতে মস্তিষ্কের উপর চাপ পরে।

একটা পর্যায় চোখ ও মস্তিষ্ক বিশ্রাম চায় তখন একটুখানি ঘুমও অমৃতের মতো মনে হয়। এবং, আমরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পরি।

বিছানায় পড়তে বসা! বিছানা হলো আরাম করার জায়গা। বিছানায় শুধু আরাম করতে হবে এমন ম্যাসেজেই অভ্যস্ত আমাদের মস্তিষ্ক।

তাই বিছানায় পড়তে বসলে কোনো একসময় আধশোয়াবস্থায় পড়তে ইচ্ছে করবে। এবং, কোনো একসময় আপনি শুয়েই পরবেন। এরপর মস্তিষ্ক ভাববে একটু ঘুমিয়ে নিলে ক্ষতি কি?

অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই বিছানায় পড়তে বসে তাদের জন্য পড়ার সময় ঘুম পাওয়া বা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাওয়ার জন্য এই অভ্যাসটিই দায়ী।

এখন জেনে নেওয়া যাক অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় বা কৌশলগুলো-

১. পানি পান ও ব্যবহার করুন – অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় সমূহের মধ্যে অন্যতম

দীর্ঘসময় ধরে কোনো কিছু করতে গেলে শরীরে আলসেমি ও একঘেয়েমি চলে আসে। তখন পালিয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে এবং পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মস্তিষ্ক সহজ ও আরামদায়ক কৌশল খোঁজে। যার ফলস্বরূপ পড়ার সময় আমাদের খুব ঘুম পায়। তাই সচল থাকতে ও ঘুম দূর করতে শরীরকে অনেকবেশি সতেজ রাখতে হবে।

এর জন্য পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি শরীরকে হাইড্রেট করুন। অর্থাৎ, পানি পান করুন। পড়ার আগে চোখ মুখে পানি দিয়ে সতেজ হয়ে নিন। হাতের নাগালে পানি রাখুন। বেশিক্ষন ধরে পড়তে পড়তে যখন ক্লান্ত লাগবে বা ঘুম পাবে তখনই যাতে চটজলদি পানি পান করে শরীরকে সতেজ করতে পারেন। খুব বেশি ঘুম পেলে উঠে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে নিবেন। এতে করে ঘুমকে কাবু করা অনেক বেশি সহজ হবে।

২. আওয়াজ করে পড়ুন

অনেকেরই অভ্যাস আছে মনে মনে পড়ার। অভ্যাসটি আপনার থাকলে আজই তা পরিহার করুন। মনে মনে পড়া খারাপ না। তবে মনে মনে পড়লে পড়া খুব সহজে মাথায় ঢুকে না। মাথায় হাজারটা চিন্তা ভাবনা চলে আসে। তাছাড়াও কখন যে ঘুমিয়ে পরেছেন তার টেরও পাবেন না।

সমস্যাগুলো থেকে বাঁচতে আওয়াজ করে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেকোনো শব্দের রেশ ০.১ সেকেন্ড পর্যন্ত আমাদের মস্তিষ্কে থাকে। যারা আওয়াজ করে পড়ে তারা এর সুবিধাটা পেয়ে থাকে। এবং যেকোনো বিষয় মনে মনে পড়ার ব্যক্তিটির থেকে দ্রুত বুঝতে পারে।

মনে মনে পড়লে পড়ার বিষয় থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে কখন যে কোন চিন্তাভাবনার সাগরে ঢুকে পরবেন তার হদিস থাকবে না। অপরদিকে আওয়াজ করে পড়লে, যখনই অন্য চিন্তা করতে যাবেন তখনই দেখবেন থেমে গেছেন এবং তৎক্ষনাৎ নিজেকে পড়ার মাঝে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

মনে মনে পড়লে চারিপাশ নির্শব্দ থাকবে। মস্তিষ্ক বারবার ঘুমের রিমাইন্ডার দিবে এবং খুব সহজেই ঘুমের অতল সাগরে ডুবে যাবেন। তাই ঘুম পেলে অবশ্যই আওয়াজ করে পড়বেন এবং সবসময়ই চেষ্টা করবেন আওয়াজ করে পড়ার।

৩. সহজ বিষয় পড়ুন

দিনে পড়লেও ছাত্রছাত্রীদের রাতে পড়া একটা নির্ধারিত রীতি বলা যায়। সারাদিনের ছুটোছুটি, পড়াশোনা, ব্যস্ততা ইত্যাদির জন্য রাতে শরীর একঘেয়ে হয়ে থাকে। তখন যদি কঠিন বিষয় পড়েন তখন পুনরায় পরিশ্রমের ভয়ে মস্তিষ্ক ঘুমিয়ে পরার নির্দেশ দেয়। কোনো একটা বিষয় কঠিন এই তথ্য যখন মস্তিষ্ক পায় তখন স্বাভাবিকভাবেই সেটা নিয়ে ভীতির সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ পড়তে বসাই হয় না।

আজ থাকুক কাল পড়বো এমন মনোভাব তৈরী হওয়ার কারনে আপনি সুন্দর করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েন। তাই সহজ বিষয় দিয়ে পড়া শুরু করুন। এর ফলে আপনি পড়াশোনার একটা জোনে চলে আসবেন। সহজ বিষয় দিয়ে পড়া শুরু করার ফলে ইতিবাচক মনোভাব তৈরী হবে আপনার মধ্যে। একটা সাবজেক্ট পড়া শেষ করার পর বাকিগুলো পড়ার তাগিদও তৈরি হবে। ফলে খুবসহজেই ঘুমকে কাবু করতে পারবেন।

আরও পড়ুন-

৪. পড়ার মাঝে বিরতি নিন

টানা অনেকক্ষন যাবৎ পড়াশোনা করলে মস্তিষ্কের ধারনক্ষমতা যেমন কমে যায়। তেমনি, শরীরেও ক্লান্তি আসে। ফলস্বরূপ আমরা ঝিমোতে থাকি এবং কোনো একসময় ঘুমিয়ে পরি। তাই পড়ার মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কতক্ষণ পরপর বিরতি নিবেন? এটার আসলে ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তবে অনেকেই ২০/২৫ মিনিট পরপরই বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটা মোটেও ফলপ্রসূ না!

নিজেই ভেবে দেখুন তো, প্রতি ২০/ ২৫ মিনিট পড়ার পর যদি ১০/২০ মিনিট বিরতি নিতে থাকেন তাহলে পড়বেনই বা কতোটুক? আর একটু পরপর বিরতি নেওয়ার ফলে মনোযোগ যে অন্যদিকে চলে যাবে না তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে?

পড়াশোনা ঠিক রেখে যদি স্মার্টলি বিরতি নিতে চান তবে সেটা হবে ঘন্টায় ১০ মিনিট বিরতি নেওয়া। এই সময়টাতে চা বা কফি পান করে খুব সহজেই শরীরকে সতেজ বানিয়ে নিতে পারেন।

অথবা বিরতির সময় করে নিতে পারেন কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। এক্সারসাইজ শরীরের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরকে রাখে সতেজ ও সচল।

পড়ার মাঝে বিরতি নেওয়ার সময় হাতে স্মার্ট ফোন না নিয়ে, রুমের এপাশ থেকে ওপাশ একটু হেঁটে নিন। অথবা করে নিন কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। ঘুম তাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল এই দুটোই।

৫. পর্যাপ্ত ঘুমান ও পাওয়ার ন্যাপ নিন

একজন সুস্থ্য মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। এর থেকে কম ঘুম যেমন শরীরে ব্যাঘাত ঘটায় ঠিক তেমনি বেশি ঘুমও শরীরের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আমাদের শরীর হচ্ছে আরামপ্রিয়। শরীরকে যতো আরাম আয়েশে রাখবেন শরীর ততো আরাম খুঁজবে।

আপনি যদি রাত ১০ টায় ঘুমোতে যেয়ে সকাল ১০ টায় উঠতে চান তাহলে শরীর আরো ২/৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতে চাইবে। কম ঘুম যেমন শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর, অনুরূপ বেশি ঘুম মারাত্নক ক্ষতিকর! তাই ঘুমের একটা নির্ধারিত সময় ঠিক করে নিন।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যান এবং একই সময় ঘুম থেকে উঠুন। নির্ধারিত সময় ঘুমোতে যাওয়ার অভ্যাস না থাকলে একেক দিন একেক সময় ঘুমোবেন। এতে করে কখনো কি আশানুরূপ ঘুম হবে? হবে না। পড়ার সময় ঠিকই টেবিলে বসে ঝিমোবেন।

অভ্যাস না থাকলে এলার্ম দিয়ে ২-৩ সপ্তাহ নির্ধারিত সময় ঠিক করে ঘুমান এবং উঠে পরুন। কোনো একটি অভ্যাস তৈরি হতে ২১-২২ দিন লাগে। ফলে খুব সহজেই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবেন এবং অসময়ে ঘুমিয়ে পরবেন না।

যদি আপনি বেশি কর্মঠ হন, তাহলে ৫/৬ ঘন্টা হয়তো ঘুমানোর সময় পান। বাকিটা সময় পড়াশোনা ও নিত্যদিনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।

এক্ষেত্রে রাতে টেবিলে বসে ঝিমোনোটাই স্বাভাবিক। এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে নিতে পারেন পাওয়ার ন্যাপ।

পাওয়ার ন্যাপ বলতে অল্প ঘুমিয়ে নেওয়াকে বোঝায়। অল্প ঘুমোতে গিয়ে অনেকে আবার ঘুমের সাগরে ডুবে যায়। পাওয়ার ন্যাপ নেওয়ার জন্য এলার্ম সিস্টেমটা অবশ্যই ব্যবহার করতে হয়।

এখন প্রশ্ন আসে কতক্ষণ পাওয়ার ন্যাপ নিবেন? এটা অবশ্যই ৩০ মিনিট বা এর কম হতে হবে। আদর্শ পাওয়ার ন্যাপ বলতে ২০ মিনিটকে ইন্ডিকেট করে।

পাওয়ার ন্যাপ নিলে আপনি একটু বিশ্রামের সুযোগ পাবেন। ২০-৩০ মিনিট শরীরকে সম্পূর্ণ বিশ্রামবস্থায় রাখলে শরীর অনেক বেশি সচল হয়। ধৈর্যক্ষমতা ও মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

তাই দিনে যখনই টায়ার্ড লাগবে তখনই ২০ মিনিটের টাইমার সেট করে গা এলিয়ে শুয়ে পরুন বা বসা অবস্থায় সুবিধা মতো চোখ বুঝে ঘুমিয়ে পরুন। দিনে ২-৩ বার পাওয়ার ন্যাপ নিলে রাতে পড়ার টেবিলে ঘুম আসবে না। খুব সহজেই ঘুমকে কাবু করে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারবেন।

— শেষ কথা —

অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কিত লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে বা নতুন কোন পরামর্শ বা মতামত থাকলে আমাদেরকে কমেন্ট করে জানাবেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে অন্যদেরকেও পড়ার সুযোগ করে দিন। এতে করে হয়তো আপনার খুব বেশী সময় নষ্ট হবে না। তবে এতে করে হয়তোবা লেখাটি অন্য কারো উপকারে আসতে পারে। এইজন্য বলা আরকি!

পড়ে ভালো লাগতে পারে এমন কিছু প্রকাশনা-

If you like this post; please share it

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *