চা পানের আশ্চর্য করার মতো কিছু সুফল

বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ চা পান করতে ভীষণ পছন্দ করে। ভালো লাগার বশে পান করলেও অনেকেই চায়ের উপকারীতা সম্পর্কে জানে না। চা’য়ে রয়েছে ট্যানিক এসিড। ট্যানিক এসিড রোদে পোড়াভাব দূর করে। এছাড়া চায়ে রয়েছে গুয়ানিন, ট্যানিন, এথিক্সিন, পিউরিন ইত্যাদি এগুলোকে একসাথে এন্টিঅক্সিডেন্ট বলে।

এতে থাকা এন্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে করে তুলে প্রাণবন্ত ও ঝকঝকে এছাড়াও এটি টোনারের কাজ করে থাকে। চায়ের অনেক প্রকারভেদ রয়েছে। যেমনঃ- লাল চা, সবুজ চা, লেবু চা, লবঙ্গ চা, আদা চা। প্রত্যেকটিরই রয়েছে আলাদা আলাদা পুষ্টিগুন ও রোগ নিরাময়ক ক্ষমতা। আসুন জেনে নেওয়া যাক, কোন চা পান করলে কি ধরনের উপকারিতা পাওয়া যায়।

লাল চা

ক্যাফেইন,পটাশিয়াম, ফ্লোরাইড, কার্বোহাইড্রেট, মিনারেল, ম্যাঙ্গানিজ, পলিফেলন ইত্যাদি পুষ্টিগুন রয়েছে লাল চায়ে।
লাল চায়ে রয়েছে ট্যানিন ফ্লু, যা ঠান্ডা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে শরীরকে রক্ষা করে। শরীরের জ্বালাপোড়া রোগ থাকলে দূর করে। এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যানসার প্রতিরোধ করে। যেমনঃ- জরায়ু, ব্লাড, ফুসফুস ক্যানসার প্রতিরোধ করে। তাছাড়াও এতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা দাতের ক্ষয় রোধ করে।

এতে থাকা পুষ্টিগুন রোগ প্রতিরোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমায়। ফলে হার্ট ভালো থাকে। লাল চায়ে থাকা ট্যানিন হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধ করে।রক্তের পরিবহনকে উন্নত করে। দেহকে সতেজ করে। কাজে মনোযোগ বাড়ায় ও মানসিক চাপ কমায়।

সবুজ চা বা গ্রীন টি

গ্রীন টিতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরকে করে তোলে সতেজ। ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। উচ্চরক্তচাপ কমায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখে। গ্রীন টি হজম প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে অতিরিক্ত মেদ কমায়। এতে রয়েছে ক্যটেচিন নামক উপাদান যা অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলে। তাই বর্তমানে মেদ কমানোর জন্য অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত গ্রীন টি পান করছে।

ওজন কমাতে গ্রীন টি’র কার্যকারিতা

গ্রীন টিতে রয়েছে ভিটামিন – এ, বি, বি৫, সি, ই, ডি, এইচ, সেলেনিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ও সামান্য পরিমান ক্যাফেইন। আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে তাপ উৎপন্ন হয়ে থাকে যা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে। গ্রীন টি পান করলে শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়ে। তাপ বাড়লে ক্যালরি খরচ হয়। আর ক্যালরি খরচ হলে ওজন কমতে থাকে।

এই গ্রীন টি দেহের বিপাকীয় ক্ষমতা বাড়ায়। যাদের ওজন বেশি তারা নিয়মিত ব্যয়ামের পাশাপাশি গ্রীন টি পান করলে দ্রুত ওজন কমে। আর যারা ব্যয়াম করেন না কিন্তু গ্রীন টি পান করেন তারা এটা থেকে বঞ্চিত হন। সে জন্য ওজন কমানোর উদ্দেশ্য থাকলে অবশ্যই সকাল-বিকাল ব্যয়াম করার পাশাপাশি গ্রীন টি পান করতে হবে। গ্রীন টি অনেকে ভুলভাবে পান করে থাকেন। চিনি অথবা দুধ মিশিয়ে এর গুনাগুন নষ্ট করে ফেলেন অনেকেই।

ওজন কমানো যাদের গ্রীণ টি পানের উদ্দেশ্য, তাদের এটা একদম করা উচিত হবে না। ওজন কমাতে চাইলে গ্রীন টির পাশাপাশি ব্যয়াম করতে হবে এবং গ্রীন টি তে চিনি বা দুধ কোনোটাই মেশানো যাবে না।

গ্রীন টি পান করার সময়

সকালে ব্যয়াম করার ৩০ মিনিট আগে গ্রীন টি পান করা যায়। ব্যয়ামের আগে গ্রীন টি পান করলে শরীরের মেটাবলিজম কমে ও কর্মদক্ষতা বাড়ে। যার ফলে শরীরের মেদ ও ওজন কমে।

অনেকে খাবার খাওয়ার পরপরই চা পান করতে পছন্দ করেন যা একদম করা যাবে না। খাবার খাওয়ার কমপক্ষে আধঘন্টা আগে গ্রীন টি পান করতে হবে। সকালে যারা গ্রীন টি পান করেন তাদের অবশ্যই হালকা কিছু খেয়ে নিতে হবে। খালি পেটে পান করলে গ্যাস্ট্রিক হওয়ার আশংকা থাকে।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনেকে গ্রীন টি পান করে থাকেন যেটি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। তাই ঘুমোতে যাওয়ার কমপক্ষে ২ – ৩ ঘন্টা আগে গ্রীন টি পান করুন।

যখন পান করা উচিত নয়ঃ

  • সকালে খালি পেটে।
  • যেকোনো সময় ভরপেটে।
  • রাতে ঘুমোতে যাওয়ার কিছুক্ষন আগে বা মাঝরাতে।

লেবু চা

লেবু আমাদের ইমিউনো সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে। লেবুতে থাকে সাইট্রিক এসিড যা শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। ফলে ইনফেকশন কমে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। লেবু লো ক্যালরি সমৃদ্ধ খাদ্য যা দেহের ওজন কমাতে সাহায্য করে৷ লেবু ইনসুলিনের উৎপাদন বাড়ায় যা ডায়বেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।

লেবু চা পানের উপকারিতা

১। লেবুতে থাকা সাইট্রিক এসিড হজমে সহায়তা করে ও কিডনিতে পাথর হওয়ার আশংকা কমায়।
২। শরীরকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করতে লেবুর ভূমিকা অপরিসীম। তাই জ্বর বা অন্য যেকোনো রোগ হলে ডাক্তাররা লেবু খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৩। লেবু চা যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় তেমনি হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম।
৪। লেবুতে থাকা সাইট্রিক এসিড ও ভিটামিন সি পেট ব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া, খাদ্য পরিপাকজনিত সমস্যা দূর করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও শরীরকে সতেজ রাখতে দিনে কমপক্ষে ২ বার লেবু চা পান করা উচিত।

লবঙ্গ চায়ের উপকারীতা

১। ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে

লবঙ্গতে রয়েছে অ্যান্টি-ক্যান্সার এজেন্ট। প্রতিদিন লবঙ্গ চা পান করলে ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

২। শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে

লবঙ্গতে উপস্থিত নিগেরিয়াসিন শরীরে প্রবেশের পর ইনসুলিনের কর্মক্ষমতাকে বাড়ায় যা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ডায়বেটিস রোগীদের জন্য শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক বেশি জরুরি। তাই ডায়বেটিস রোগীদের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিনে একবার বাধ্যতামূলকভাবে লবঙ্গ চা পান করা দরকার।

৩। ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ কমায়

লবঙ্গতে আছে ভিটামিন কে ও ভিটামিন-ই। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে করে তোলে আরো বেশি শক্তিশালী। ফলে ভাইরাস সংক্রমণের আশংকাও অনেক কমে যায়। তাই ভাইরাস জ্বরে লবঙ্গ অনেক বেশি উপকারী।

৪। দাঁতের ব্যথা নিরাময় করে

লবঙ্গতে থাকা অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান বিক্রিয়া করে অতি দ্রুত দাঁতের যন্ত্রণা কমায়। দাতে ব্যথা, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা মাড়ি থেকে রক্ত পরা ইত্যাদি সমস্যা আক্রান্ত ব্যক্তিদের লবঙ্গ চা দ্রুত উপশম দিতে পারবে।

৫। বমি ভাব দূর করে

কয়েক ফোঁটা লবঙ্গ তেল বা গোটা লবঙ্গ চায়ে মিশিয়ে পান করলে নিমিষেই বমি বমি ভাব দূর হয়।

লবঙ্গ চা যেভাবে বানাবেন

গোটা লবঙ্গ নিলে এর উপাদান ভালোভাবে পানিতে মিশে না। তাই এ সমস্যা এড়াতে পরিমাণ মতো লবঙ্গ বেঁটে নিতে হবে। পানিতে লবঙ্গ বাঁটা দিয়ে ফুটাতে হবে এবং চা পাতি ও অল্প পরিমাণ চিনি দিয়ে দিতে হবে। এরপর ছেঁকে তৈরিকৃত লবঙ্গ চা পান করুন।

লবঙ্গ চা পান করলে শরীরে ফাইবার, আয়রন, ভিটামিন কে, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালসিয়ামসহ আরো প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান শরীরে প্রবেশ করে এবং নানারকম সমস্যা সমাধানে ভূমিকা পালন করে।

আদা চা

আদাতে ভিটামিন সি ও ম্যাগনেসিয়াম সহ আরো অনেক উপকারী উপাদান রয়েছে। এছাড়াও এতে রয়েছে জীবাণুরোধকারী উপাদান। আদা চা, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা ও জ্বর জ্বরভাব কমায়। আদা চায়ের বিস্তারিত উপকারীতা নিচে দেওয়া হলোঃ

১। হজমের সমস্যায় সবচেয়ে দ্রুত নিরাময় দেয় আদা। তাই হজমজনিত সমস্যা থাকলে সাত-পাঁচ না ভেবে দ্রুত আদা চা পান করুন। আদা চা এতোটাই দ্রুততার সাথে হজম সমস্যা দূর করে যে হজমের কথা ওঠলেই আদা চায়ের নাম সবার প্রথমে থাকে।

২। আদা চা হজম সংক্রান্ত এনজাইম নিঃসরণ ঘটায় ও পরিপাকে সাহায্য করে এবং খাবারের অরুচি দূর করে।

৩। আদাতে খনিজ, এমিনো এসিড ও ভিটামিন রয়েছে যা রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে ও হার্ট সুস্থ্য রাখে৷ তাই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত আদা চা পান করুন।

৪। মাথা ঘুরানো সমস্যায় ও অস্থিরতা ভাব কাটাতে দ্রুত উপশম পেতে আদা চা পান করুন।

৫। ঠান্ডা ও কাঁশির সমস্যায় আদা চায়ের বিকল্প নেই। নানাবিধ প্রাকৃতিক উপাদান বিদ্যমান থাকায় কফ ও কাঁশি দ্রুত দূর করতে এর ভূমিকা অপরিসীম।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে নিতে পারেন-