চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার উপায়

চোখের নিচে কালো দাগ? কেউ আপনাকে দেখলেই জিজ্ঞেেস করে- চোখের নিচে কালি লাগিয়েছেন? নিজেকে নিজে বারবার জিজ্ঞেস করছেন- কেন এই কালো দাগ? কিভাবে দূর করবেন? আসুন একটু জেনে নেই, চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার উপায় সম্বন্ধে বিস্তারিত সবকিছু।

চোখে নিচে কালো দাগ কেন হয়?

আপনি জেনে অবাক হবেন যে শুধুমাত্র ঘুম না হওয়া কিংবা কম্পিউটারের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকাটাই চোখের নিচে কালো দাগ পরার বিশেষ কারণ নয়। বংশগত সমস্যা অ্যালার্জি কিংবা চোখের নিচে রক্ত চলাচলে সমস্যা থাকার কারণেও চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে। তাছাড়া আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে।

অপর্যাপ্ত ঘুম ও দেরিতে ঘুমানো

অপর্যাপ্ত ঘুম, বেশি রাত জেগে থাকার অভ্যাসের কারণে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ পড়তে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুম আপনার ত্বককে নিস্তেজ ও ফ্যাকাসে করে তোলে। এতে করে আপনার ত্বকের নীচের কালো টিস্যু ও রক্তনালীগুলি দৃশ্যমান হয়ে পড়ে।

এছাড়াও ঘুমের অভাবে আপনার চোখের নিচে এক প্রকার তরল পদার্থ জমা হতে পারে। যাকে চোখের নিচের থলে বলা হয়। তাই চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।

বয়সের প্রভাব

চোখের নিচের কালো দাগের আরও একটি কারণ বয়স বেড়ে যাওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক আরও পাতলা হতে থাকে। বয়সের সঙ্গে ত্বকের প্রয়োজনীয় চর্বি ও কোলাজেনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে। ত্বকের নীচের অন্ধকার রক্তনালীগুলি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং চোখের নিচের অঞ্চলটি কালো হয়ে যায়।

চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ

টেলিভিশন বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। যার ফলে আপনার চোখের চারপাশের রক্তনালীগুলি বড় হয়ে যেতে পারে এবং আপনার চোখের চারপাশের ত্বক কালো হয়ে যায়।

অ্যালার্জি

অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, এটোপিক ডার্মাটাইটিস, একজিমা, প্রভৃতি কমন ডার্মাটাইটিস জাতীয় সমস্যা যাদের থাকে, তাদের এ সমস্যা হতে পারে। এতে চোখের নিচে চুলকায়। দেখা যায় এই ধরণের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত চোখ চুলকাচ্ছে। ঘষাঘষি করছে। এ কারণে চোখের নীচে কালো দাগের সৃষ্টি হতে পারে। একে সেকেন্ডারি পিআই বা পোস্ট ইনফ্লেমেটরি হাইপার পিগমেন্টেশন বলা হয়।

অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ায় ত্বককে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষার করতে আপনার দেহ হিস্টামিন নিঃসরণ ঘটায়। এর ফলে চোখে চুলকানি, চোখ লাল হওয়া প্রভৃতি অস্বস্তিকর লক্ষণ দেখা দেয়।

এছাড়াও হিস্টামিন আপনার রক্তকণিকা সমূহকে প্রশস্ত করে দেয় এবং তা আপনার ত্বকের নিচে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

অ্যালার্জির কারণে সৃষ্ট চুলকানির ফলে চোখের চারপাশে ত্বক ঘষা বা চুলকানোর ইচ্ছা জেগে ওঠে। যা করলে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।

জ্বলুনি, ফোলাভাব ও রক্তনালীগুলি ভেঙে যেতে পারে। ফলে চোখের নিচে কালো দাগ তৈরি হবে।

পানিশূণ্যতা বা ডিহাইড্রেশন

ডিহাইড্রেশন বা পানিশূণ্যতা চোখের নিচে কালো দাগ পড়ার একটি অন্যতম কারণ। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির সরবরাহ না থাকলে চোখের নীচের ত্বক নিস্তেজ হতে শুরু করে এবং চোখের নিচটা কালো হয়ে যায়।

রোদ

বেশীক্ষণ রোদে থাকলে শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণ মেলানিনের সৃষ্টি হয়। যা আমাদের ত্বককে রঙিন করে তোলে এবং যার কারণে চোখের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রঞ্জকতা বৃদ্ধি পায়। যা চোখের নিচের অংশে কালো দাগ সৃষ্টি করে থাকে।

অ্যানাটমিক্যাল ডিফেক্ট

আমাদের চোখের নিচে একটি গর্ত আছে। একে আমরা টিয়ার ট্রাফ্ট বলে থাকি। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় এ গর্তটা অনেক গভীর। গভীরতার কারণে ছায়া পড়ে। এটা দাগ নয়, তবে কালচে ভাবটা আসে।

চর্বি

বয়সের সঙ্গে আমাদের শরীরে যে চর্বিটা থাকে তা সরে যায় বা শুকিয়ে যায়। চোখের নীচের চর্বি শুকিয়ে গেলে সেখানে এক প্রকার গর্তের সৃষ্টি হয় এবং স্থানটা কালচে হয়ে থাকে।

সাধারণত চোখের নিচের কালো দাগ উপরে আলোচিত কারণগুলির উপর প্রধানত নির্ভর করে। তাই প্রথমে কেন এটি হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে তার প্রতিকার করতে হবে। তবে এর কিছু ঘরোয়া সমাধানও রয়েছে।

চোখের নিচের কালো দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায়

বরফ

বরফ দিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করলে ঠাণ্ডায় কোষগুলি সংকোচনের ফলে ফোলা ভাব কমতে পারে। এটি প্রসারিত রক্তনালীগুলিকে সঙ্কুচিত করতে সহায়তা করবে। ফলে কালো দাগ দূর হবে।

একটি পরিষ্কার কাপড়ে কয়েকটি বরফ টুকরো মুড়ে আপনার চোখে লাগান। এভাবে ২০ মিনিট করতে পারেন।

টি-ব্যাগ

টি-ব্যাগ ভিজিয়ে চোখের উপর দিয়ে রাখুন। চায়ে ক্যাফেইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা রক্ত সঞ্চালনকে বাড়িয়ে দেয়। এটি রক্তনালী সঙ্কুচিত করতে এবং ত্বকের নীচে জমে যাওয়া তরল পদার্থ হ্রাস করতে সহায়তা করে।

দুটি কালো বা সবুজ টি-ব্যাগ গরম পানিতে পাঁচ মিনিটের জন্য ভিজিয়ে রাখুন। তারপর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য ফ্রিজে ঠাণ্ডা করে নিন। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে চোখের উপর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য টি-ব্যাগগুলি রেখে দিন। এরপরে ঠাণ্ডা পানিতে চোখ ধুয়ে ফেলুন।

শসা
চোখের নিচে কালি দূর করতে শসা অত্যন্ত কার্যকর। শসা কুচি করে কেটে চোখের নিচে দিয়ে ৩০ মিনিট রাখতে হবে। এছাড়া শসার রস বের করে তুলার বলের সাহায্যেও ব্যবহার করতে পারেন। ঝামেলা এড়াতে চাইলে, শসা স্লাইস করে কেটে চোখের ওপর রাখুন। উপকার পাবেন।

শসায় আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি চোখের নিচের কালি দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া চোখের ফোলা ভাব দূর করতেও ব্যবহার করতে পারেন শসা। চাইলে মাঝে মাঝে শসা রসের সঙ্গে লেবুও যোগ করতে পারেন।

গোলাপ জল

দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তার ছাপ চেহারায় পড়লে চোখ খুব মলিন দেখায়। চোখের নিচে কালো দাগ-ছোপ পড়ে। এই ধরনের সমস্যা দূর করতে গোলাপ জল অত্যন্ত কার্যকর। গোলাপ জল তুলার বলের সাহায্যে চোখের নিচে লাগাতে পারেন। চোখের ক্লান্তিভাব দূর হবে।

আলু

ত্বকের কালো দাগছোপ দূর করতে আলু বেশ কার্যকর। সেই হিসেবে, চোখের নিচের কালি দূর করতে আলুর জুড়ি নেই। আলু থেঁতলে চোখের ওপর ১৫ মিনিট রাখতে পারেন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে চোখের নিচের কালো দাগ দূর হবে।

দুধ

দুধে রয়েছে ভিটামিন এ। কাঁচা দুধ ত্বকের জন্য খুবই উপকারি। তুলার বল বা মেকআপ রিমুভার প্যাডে পরিমাণমতো দুধ নিয়ে চোখের নিচে লাগিয়ে রাখুন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এভাবে সপ্তাহে ৩-৪ দিন কাঁচা দুধ ত্বকে ব্যবহার করলে ডার্ক সার্কেল দূর হবে।

ভিটামিন ই

ভিটামিন ই ক্যাপসুলের ভেতরে যে তেল থাকে, তা চোখের নিচের কালচে ভাব দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। এই তেল রাতে ঘুমানোর আগে চোখের নিচে মেখে নিতে হবে। সকালে ফেস ওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। এভাবে নিয়মিত ব্যবহারে অনেক উপকার পাবেন।

ডার্ক সার্কেল চোখের নিচে কালো দাগ দূর করতে ক্রিম ব্যবহার যদি করতেই হয় তবে ভালো মানের কিনা তা দেখে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ বা মলম ব্যবহার করা যাবে না।

সম্পাদকের বাছাই-

Leave a Comment