ডার্মারোলার কি? কিভাবে ঘরে বসেই ব্যবহার করবেন?

ত্বকের অবাঞ্চিত দাগ ও চুলের নানান সমস্যা সমাধানের একটি আধুনিক পদ্ধতি হলো মাইক্রোনিডলিং। এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয় সুঁই যুক্ত একটি রোলারের সাহায্যে, যাকে বলা হয় ডার্মারোলার। এই রোলারটি ব্রণের দাগ-ছোপ, গর্ত, স্ট্রেচ মার্ক, বয়সের ছাপসহ ত্বকের নানান সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এটি চুল পড়া কমিয়ে চুলের বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে থাকে।

এখন শুধু ক্লিনিকে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের হাতেই নয়, আপনি ডার্মারোলার ব্যবহার করতে পারেন ঘরে বসে নিজ হাতেই। তবে এজন্য ডার্মারোলার কেনা থেকে শুরু করে ব্যবহার, সংরক্ষণ – সকল ক্ষেত্রেই মেনে চলতে হবে কিছু বিশেষ নিয়ম।

ডার্মারোলার কি? এটি ত্বক ও চুলের জন্য কতটা উপকারী?

ডার্মারোলার হলো অসংখ্য টাইটেনিয়াম মাইক্রোনিডেল বা ছোট ছোট সুইযুক্ত এক ধরণের রোলার যেটি ত্বক ও স্কার্ল্ফের বাইরের আবরণে অসংখ্য ছিদ্র তৈরি করে ত্বক ও চুলের নানান সমস্যা দূর করে।

ত্বক ও চুলের যত্নে ডার্মারোলার ব্যবহার

১. ব্রণ চলে যাওয়ার পরও অনেক সময় ব্রণের দাগ থেকে যায়। অনেকের আবার ব্রণের পর দেখা দেয় ছোট ছোট গর্ত। ব্রণ নিজ থেকে চলে গেলেও এসব দাগ বা গর্ত কিন্তু চলে যায় না। ডার্মারোলার ব্যবহার করে এই দাগ ও গর্তগুলো পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যায়।

২. নামিদামি অনেক ক্রিম ও স্ক্রাবারও হাইপার পিগমেন্টেশন বা মেছতা দূর করতে পারে না। এক্ষেত্রে ডার্মারোলার ব্যবহার করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি পার্থক্য বুঝতে পারবেন। নিয়মিত ব্যবহারে এসব দাগ বা মেছতা একসময় পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।

৩. ডার্মারোলার ব্যবহার ত্বককে বয়সের আগে কুঁচকে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। যদি আপনার ত্বকে ইতোমধ্যে রিংকেল বা বলিরেখা পড়ে গিয়ে থাকে তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ডার্মারোলার আপনার কুঁচকে যাওয়া চামড়া বা বলিরেখা ঠিক করতেও সাহায্য করবে।

৪. সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি ত্বকে কালো দাগ সৃষ্টি করে। অনেক সময় এসব দাগ ত্বকে একদম সেঁটে যায়। এক্ষেত্রেও ডার্মারোলার ব্যবহার খুবই কার্যকর।

৫. স্ট্রেচ মার্ক বা কোন সার্জারির কারণে ত্বকে দাগের সৃষ্টি হতে পারে। এই স্ট্রেচ মার্কস দূর করতে মাইক্রোনিডলিং খুবই ভালো একটি পদ্ধতি।

৬. ডার্মারোলার ব্যবহার আমাদের মাথার সামনের অংশে চুল কমতে থাকা ও চুল পড়ে হেয়ার লস হওয়ার সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়।

৭. ডার্মারোলার ব্যবহারে সৃষ্ট ছিদ্রগুলোর মাধ্যমে সিরাম ও ময়েশ্চরাইজারের সম্পূর্ণ গুণাগুণ ত্বকের গভীরে পৌঁছাতে পারে।

ডার্মারোলার কিভাবে কাজ করে?

এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে একটি সুইযুক্ত রোলার কিভাবে ত্বকের সমস্যায় কাজ করবে! যেহেতু ডার্মারোলারে অসংখ্য নিডেল বা সুই থাকে, সেটা রোল করলে ত্বকে ছোট ছোট অনেক ছিদ্র সৃষ্টি হয়। ভয় পাবেন না, এই ছিদ্রগুলো আপনার ত্বকের কোনরকম ক্ষতি করবে না। বরং এগুলোই আপনার ত্বকের সমস্যা দূর করবে।

কিভাবে?

আসলে ডার্মারোলার ত্বকের সমস্যা দূর করে মস্তিষ্ককে বোকা বানিয়ে। অবাক হচ্ছেন? আমাদের শরীরে দারুন একটি রিপেয়ারিং বা হিলিং সিস্টেম আছে। আমরা যখন কোন আঘাত পাই তখন সে রিপেয়ারিং সিস্টেম নিজে থেকে কাজ করা শুরু করে।

ধরুন আপনার হাতে কোন আঘাতের কারণে রক্ত ঝরছে। তখন কি হবে? আপনার দেহের রিপেয়ারিং সিস্টেম বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে প্রথমে সেখানে রক্ত ঝরা বন্ধ করবে। এরপর সেখানে নতুন কোষ বা টিস্যু সৃষ্টি হয়ে ক্ষতস্থানে আবরণ তৈরি হবে। ধীরে ধীরে সে আবরণ উঠে গিয়ে আপনার ত্বক পুরোপুরি আগের মতো হয়ে যাবে। ত্বক সেরে ওঠার পর আর নতুন করে সেখানে হরমোন পাঠানো হবে না।

ব্রণের ক্ষেত্রেও তাই। আপনার শরীর বিভিন্ন হরমোন ও কোলাজেন নিঃসরণের মাধ্যমে ব্রণ দূর করে। কিন্তু এরপর ব্রণের দাগ বা গর্ত দূর করতে নতুন করে কোন কোলাজেন বা হরমোন পাঠানো হয় না। যেকারণে ঐ দাগ ও গর্তগুলো থেকেই যায়।

মেছতা বা কালো দাগের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে যেহেতু রক্তক্ষরণ হয় না তাই আপনার মস্তিষ্ক সেখানে কোন কোলাজেন পাঠায় না। তাই প্রাকৃতিকভাবে সে দাগগুলো কখনোই সেরে ওঠে না।

আমাদের দেহগঠনের মূল উপাদান হচ্ছে প্রোটিন। এই প্রোটিনের বেশিরভাগ অংশ হলো কোলাজেন। কোলাজেনের অভাবেই ব্রণ, রিংকেলসহ ত্বকের নানান সমস্যা দেখা দেয়। সেজন্য ত্বকের দাগ, গর্ত বা বলিরেখা সারাতে সেসকল স্থানে কোলাজেন পৌঁছানো প্রয়োজন। কিন্তু এমনি এমনি তো কোলাজেন সেখানে চলে আসবে না। সেগুলোকে নিয়ে আসতে হবে।

যখন আপনি ডার্মারোলার দিয়ে ত্বকে রোল করবেন, সেখানে অসংখ্য ছিদ্র সৃষ্টি হবে। আপনার মস্তিষ্ক তখন ভাববে আপনার ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত। তখন সে সেখানে কোলাজেনসহ সকল প্রয়োজনীয় হরমোন পাঠাবে। এই উপাদানগুলো যেমন রোলারের ছোট ছোট ছিদ্রগুলো সারাবে তার পাশাপাশি ব্রণের দাগ, গর্ত বা বলিরেখা সারাতেও কাজ করবে। স্কার্ল্ফের ক্ষেত্রে ডার্মারোলার রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে চুলের বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

ত্বকের সমস্যা দূর করতে সিরামের কার্যকারিতা কমবেশি সবারই জানা। ডার্মারোলারে সৃষ্ট ছিদ্রগুলো এই সিরাম আমাদের ত্বকের গভীরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। যার ফলে ত্বকের সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করা অনেকটা সহজ হয়।

ডার্মারোলার কত প্রকার এবং কোন ডার্মারোলারটি আপনার জন্য প্রয়োজন?

বাজারে বিভিন্ন ধরনের ডার্মারোলার পাওয়া যায়। ডার্মারোলারের এই ভিন্নতা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর।

১.নিডেল বা সুইয়ের সংখ্যা
২.নিডেল বা সুইয়ের দৈর্ঘ্য

নিডেলের সংখ্যা অনুযায়ী ডার্মারোলার দুই ধরণের।

১. ১৯২ নিডেলের ডার্মারোলার
২. ৫৪০ নিডেলের ডার্মারোলার

বুঝতেই পারছেন, যে ডার্মারোলারে নিডেলের সংখ্যা বেশি সেটি ত্বকে বেশি ছিদ্র তৈরি করবে। আর ছিদ্র যত বেশি হবে কোলাজেনের নিঃসরণ তত বাড়বে। এজন্য আপনার ত্বকে যে সমস্যাই থাকুক না কেন ৫৪০ নিডেলের ডার্মারোলারই আপনার জন্য বেশি উপযোগী।

ডার্মারোলারে নিডেলের দৈর্ঘ্য ০.২ থেকে শুরু করে কয়েক ধরণের হয়। যেমন-

১) ০.২ মিলিমিটার
২) ০.২৫ মিলিমিটার
৩) ০.৫ মিলিমিটার
৪) ০.৭৫ মিলিমিটার
৫) ১.০০ মিলিমিটার
৬) ১.২৫ মিলিমিটার
৭) ১.৫০ মিলিমিটার
৮) ২.০০ মিলিমিটার

এছাড়া আরও বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের নিডেলের ডার্মারোলার পাওয়া যায়। এখানে যে নিডেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি তা ত্বকের তত গভীরে যাবে। আর নিডেল যত গভীরে যাবে তা ত্বকের জন্য ততই কার্যকর হবে।

এখন আপনি হয়তো ভাবছেন সবচেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যের নিডেলের ডার্মারোলারই আপনার কেনা উচিত। কিন্তু তা নয়। ০.২ মিলিমিটার থেকে ০.৫০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের নিডেলের ডার্মারোলা হলো বাড়িতে ব্যবহারের জন্য। আর এর উপরে যেগুলো আছে সেগুলো শুধু ডাক্তার ও ডার্মালজিস্টরা ক্লিনিকে মাইক্রোনিডলিং এর জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। এগুলো আপনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনমতেই বাড়িতে ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ এসব ডার্মারোলারে রক্তক্ষরণ ও ত্বকের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আপনার ত্বকে যদি তেমন কোন সমস্যা না থাকে তাহলে উপরের দিকে না গিয়ে ০.২০-০.২৫ মিলিমিটারের নিডেলই বেছে নেওয়া উচিত। ০.২০ ও ০.২৫ মিলিমিটারে খুব বেশি পার্থক্য নেই। এক্ষেত্রে ০.২৫ মিলিমিটার নিডেলের ডার্মারোলার ব্যবহার করাই ভালো হবে।

যদি আপনার ত্বকে ছোট ছোট ব্রণের দাগ বা হালকা কালো দাগ থাকে বা আপনার ত্বক সামান্য সেনসেটিভ হয় তবে আপনার জন্য ০.২৫ মিলিমিটার নিডেলের ডার্মারোলারই উপযুক্ত হবে।

চোখের নিচে ও ঠোঁটে রোলিং এর জন্য ০.২০-০.২৫ মিলিমিটার নিডেলের ডার্মারোলার ব্যবহার করতে হবে। ০.৫০ মিলিমিটার বা তার উপরের দৈর্ঘ্য ঠোঁট ও আন্ডার আই এরিয়ার জন্য উপযোগী নয়।

আর মুখে যদি গর্ত, মেছতা বা কালো দাগের পরিমাণ বেশি হয় তাহলে আপনার জন্য ০.৫০ মিলিমিটারের নিডেলটা ভালো হবে।
চুলের জন্য ০.২৫ ও ০.৫০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের নিডেল ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া ডার্মারোলার কেনার আগে আপনি কোন ডার্মালজিস্টের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।

কিভাবে ব্যবহার করবেন ডার্মারোলার?

ডার্মারোলার ব্যবহারে কয়েকটি ধাপ আপনাকে ধারাবাহিকভাবে মানতে হবে।

১. ডার্মারোলার প্রস্তুত করা
২. ত্বক প্রস্তুত করা
৩ ডার্মারোলার রোল করা
৪. সিরাম ও ময়েশ্চরাইজার ব্যবহার
৫. ডার্মারোলার সংরক্ষণ

১. ডার্মারোলার প্রস্তুত করা

যেহেতু ডার্মারোলারের নিডেলগুলো ত্বকের ভেতরে ঢুকে যাবে তাই ব্যবহারের আগে অবশ্যই একে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। সাবান-পানি দিয়ে ডার্মারোলার জীবাণুমুক্ত হবে না। এজন্য প্রয়োজন রাবিং অ্যালকোহল। যাকে বলা হয় আইসো প্রোপাইল অ্যালকোহল বা হেক্সিসল।

ডার্মারোলারের সম্পূর্ণ মাথাটি ৭০-৭৫% আইসো প্রোপাইল অ্যালকোহলে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এরপর ৫ মিনিট পরিষ্কার কোন কাপড়/জায়গার উপর খোলা রেখে নিজ থেকে শুকাতে দিন। এবার আপনার ডার্মারোলারটি ব্যবহারের জন্য একদম প্রস্তুত।

২. ত্বক প্রস্তুত করা

মাইক্রোনিডলিং এর আগে ত্বক ভালো করে পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য প্রথমে ক্যামিকেল ফ্রি ফেসওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে নিতে হবে। মুখ ধোয়ার জন্য কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা উচিত। এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ত্বক ভালো করে মুছে নিতে হবে। ডার্মারোলার ব্যবহারের ২ দিন আগে মুখে স্ক্রাবিং করতে পারেন।

চুলের যত্নে ডার্মারোলার ব্যবহারের আগে মাথার ত্বক বা স্কার্ল্ফ শ্যাম্পু দিয়ে খুব ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ভেজা স্কার্ল্ফে ডার্মারোলার ব্যবহার করা যাবে না। রোলিং এর জন্য স্কার্ল্ফ ও চুল অবশ্যই শুকনো হতে হবে।

৩. ডার্মারোলার রোল করা

এখন পালা ত্বক বা স্কার্ল্ফে ডার্মারোলার রোল করার। আপনি চাইলে ডার্মারোলার সম্পূর্ণ মুখেই রোল করতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হলো আপনি কিভাবে রোল করবেন। মুখের একপাশ থেকে অন্যপাশে একবারে আড়াআড়ি রোল করে যাবে? নাকি কপাল, গাল ও চিবুক হয়ে গোলাকারভাবে রোল করবেন?

কোনটাই নয়। রোলিং এর জন্য মুখের বিভিন্ন অংশকে মনে মনে কয়েকটি শাখায় ভাগ করে নিতে হবে। যেমন: গালের উপরে ও নিচের অংশকে আলাদা এরিয়া হিসেবে বিবেচনা করে আমরা দুটি শাখায় ভাগ করতে পারি।

এবার প্রথমে একটি এরিয়া নির্বাচন করুন। এবং শুধু সেখানেই রোল করুন। এই রোলিং করতে হবে তিনটি ধাপে।

1.Vertical বা লম্বালম্বি
2.Horizontal বা আড়াআড়ি
3.Diagonal বা কোণাকুণি

প্রথমে লম্বালম্বি রোল করতে হবে ৮-১০ বার, এরপর আড়াআড়ি ৮-১০ বার এবং তারপর কোণাকুণি ৮-১০ বার। ব্যাস হয়ে গেল ঐ এরিয়ার রোলিং। এভাবে সম্পূর্ণ মুখে আলাদা আলাদা ভাবে রোল করতে হবে। রোলিং এর স্পিড রাখা উচিত মিডিয়াম। সেইসাথে স্পিড সবসময় সমান রাখার চেষ্টা করতে হবে। হঠাৎ খুব দ্রুত আবার পরক্ষণেই হালকা গতিতে রোল করা হলে আপনার ত্বকে জ্বালাপোড়া শুরু হবে।

চুলে রোল করার আগে সিঁথি করে নিতে হবে। এখানে লম্বালম্বি, আড়াআড়ির নিয়ম খাটবে না। সিঁথি করে যেভাবে চিরুনি ব্যবহার করা হয় সেভাবে ডার্মারোলার রোল করতে হবে। সম্পূর্ণ স্কার্ল্ফে রোল করার প্রয়োজন নেই। শুধু যেখানে চুল কমে যাচ্ছে সেখানে রোল করলেই হবে।

৪. সিরাম ও ময়েশ্চরাইজার ব্যবহার

ডার্মারোলার রোলিং এর পর ত্বকে ভিটামিন সি বা ভিটামিন ই জাতীয় সিরাম লাগাতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় ভিটামিন সি সিরাম ব্যবহার করা। সিরামের উপাদানগুলো ত্বকের গভীরে গিয়ে ত্বককে ভেতর থেকে স্বাস্থ্যজ্জ্বোল রাখবে। তবে হোমমেড সিরাম ব্যবহার করতে যাবেন না; ত্বকে অস্বস্তি হবে।

সিরামের পর আপনি চাইলে কোন ময়েশ্চরাইজার ব্যবহার করতে পারেন। হোম মেড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে চাইলে এমন কোন ক্রিম ব্যবহার করুন যেটা অ্যালোভেরা দিয়ে তৈরি।

যদি আপনার কাছে সিরাম বা ময়েশ্চারাইজার না থাকে তবে আপনি তাজা অ্যালোভেরা কেটে সেখান থেকে জেল বের করে সরাসরি লাগাতে পারেন। কিন্তু মার্কেট থেকে আনা অ্যালোভেরা জেল কোনমতেই ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এসকল জেলে ক্যামিকেল ও আর্টিফিসিয়াল কালার যোগ করা হয়।

৫. ডার্মারোলার সংরক্ষণ

ব্যবহারের পর ডার্মারোলার পরিষ্কার করতে ভুলবেন না। রোলারটি আবারো ৭০% আইসো প্রোপাইল অ্যালকোহলে ৮-১০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। নির্দিষ্ট বক্সে রাখার আগে ডার্মারোলারটি বাতাসে শুকিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে চিন্তার কিছু নেই। ডার্মারোলারের সাথেই আপনি সংরক্ষণের উপযুক্ত বক্স পেয়ে যাবেন।

ডার্মারোলার কি প্রতিদিন ব্যবহার করতে হবে?

ডার্মারোলার আপনার ত্বকে ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি করে; এই ছিদ্র ঠিক হওয়ার আগে আবারো ডার্মারোলার ব্যবহার করা ঠিক হবে না। আপনার ডার্মারোলারের নিডেল যদি ০.২০ বা ০.২৫ মিলিমিটার হয় তাহলে আপনি সেটা ৩-৪ দিন পর পর ব্যবহার করতে পারেন।

আর যদি নিডেলের দৈর্ঘ্য ০.৫ মিলিমিটার হয় তাহলে সেটা সপ্তাহে একবার করে ব্যবহার করতে হবে। ০.৫০ মিলিমিটারের উপরে হলে ১৫ দিনে একবার ব্যবহার করা উচিত।

যদি ভেবে থাকেন একটি ডার্মারোলার দিয়েই আপনি সারাজীবন কাটিয়ে দেবেন তাহলে আপনার ধারণা ভুল। একটি ডার্মারোলার আপনি সর্বোচ্চ ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবেন।

ডার্মারোলার ব্যববহারে সতর্কতা

শরীরে কোথাও কেটে গেলে আপনি কি করবেন? নিশ্চই ব্যান্ডেস করবেন যেন ভেতরে ধুলোবালি/জীবাণু না পৌঁছে, তাইতো? ডার্মারোলার ব্যবহারে ত্বকে ছিদ্র সৃষ্টি হলেও সেখানে ব্যান্ডেজ করার প্রয়োজন নেই। তবে অবশ্যই সে স্থান ধুলোবালি, জীবাণু ও রোদ থেকে দূরে রাখতে হবে।

এজন্য ডার্মারোলার ব্যবহারের পর ২৪ ঘন্টা বাইরে না যাওয়াই মঙ্গল। খুব বেশি প্রয়োজন হলে সানস্ক্রিম, স্কার্ল্ফ, হ্যাটসহ সম্পূর্ণ সুরক্ষিতভাবে বেড়োতে হবে। এজন্য ডার্মারোলার রাতের বেলা ব্যবহার করাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। সেইসাথে মনে রাখা প্রয়োজন আরো কয়েকটি বিষয়।

১. ত্বক ও চুল উভয় ক্ষেত্রেই রোলিং এর আগে কোন প্রসাধনী ব্যবহার করা ঠিক নয়। যেমন: হেয়ার অয়েল, ক্রিম, মেকআপ। মুখে রোলিং করলেও হেয়ার অয়েল লাগানো যাবে না।

২. ডার্মারোলার ব্যবহারের পর অবশ্যই বালিশের কভার পরিবর্তন করতে হবে।

৩. অন্তত ৮ ঘন্টা মুখ ধোয়া যাবে না। এমনকি পরিষ্কার পানি দিয়েও নয়।

৪. ৭-৮ ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতে হবে। সম্ভব হলে আরো বেশি।

৫. রোলিং এর পর ২৪ ঘন্টা মেকআপসহ সকল প্রসাধনী সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে।

৬. ট্রিটমেন্ট শুরু করার পর থেকে খাদ্যাভাসে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বেশি বেশি শাক-সবজি ও ফল রাখতে হবে।

৭. দিনে অন্তত ৬-৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত।

৮. বারবার মুখে হাত দেওয়া যাবে না। পরিষ্কার হাতেও নয়।

কতদিনে ফলফল পাওয়া যাবে?

ডার্মারোলার ব্যবহারে আপনি চটজলদি কোন ফল পাবেন না। সাধারণ কোন ক্ষত সেরে উঠতেই অন্তত ২-৩ সপ্তাহ লেগে যায়। ডার্মারোলার ব্যবহারে ট্রিটমেন্ট শুরু করার ১-২ মাস পর আপনি ফল পেতে শুরু করবেন। প্রায় ৫-৬ মাসের মধ্যেই আপনি সম্পূর্ণ ফল পেয়ে যাবেন। সময়ের ব্যাপারটা নিয়ে বিচলিত হবেন না। সময় নিয়ে না ভেবে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিন; ৬ মাস দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।

ডার্মারোলার ব্যবহার কি সবার জন্য নিরাপদ?

ডার্মারোলার সবার জন্য নিরাপদ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়। ডার্মারোলার ব্যবহারে ব্রণের দাগ, গর্তসহ নানা সমস্যা দূর হয় সত্যি, তবে ত্বকের কিছু সমস্যায় ডার্মারোলার ব্যবহার ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন-

১. যদি আপনার মুখে এক্টিভ পিম্পল অর্থাৎ যেটা যখন তখন ফেটে যেতে পারে এমন ব্রণ থাকে তাহলে আপনার জন্য ডার্মারোলার ব্যবহার নিরাপদ নয়।

২. ইনফেকশনের কারণে সৃষ্ট কোন ক্ষত থাকলে সে স্থানে রোলিং করা যাবে না।

৩. ত্বকের কোন জায়গায় Psoriasis বা দাদের সমস্যা থাকলে ঐ স্থানটা এড়িয়ে যান।

৪. ত্বক অতিরিক্ত সেনসেটিভ হলে অর্থাৎ সামান্য সূর্যের আলো বা আঘাতে যদি আপনার ত্বকে অতিরিক্ত অস্বস্তি হয়; তাহলে আপনার জন্য ডার্মারোলার ব্যবহার অর্থাৎ মাইক্রোনিডলিং পদ্ধতি একদমই উপযোগী নয়।

ডার্মারোলারের মূল্য

ভালো মানের ডার্মারোলারের দাম ৫০০ থেকে শুরু করে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এখানে ৫০০০ টাকার ডার্মারোলারটা সবচেয়ে ভালো তার মানে এই নয় যে এরচেয়ে কম মূল্যের রোলারগুলো ত্বকের জন্য কাজ করবে না।

আপনি আশেপাশে কিছু শপে ডার্মারোলার খোঁজ করে দেখতে পারেন। এছাড়া অনলাইন কিছু শপ ঘেটে দেখলেই আপনি আপনার পছন্দসই ডার্মারোলার বাজেটের মধ্যে পেয়ে যাবেন।

ডার্মারোলার ব্যবহারে আপনার ত্বকে সামান্য যন্ত্রণা হবে। কারো কারো ক্ষেত্রে সামান্য রক্ত ঝরতেও পারে। ডার্মারোলারের অসুবিধা বলতে এটুকুই। এতেও ভয় পাবার কিছু নেই। ঠিকভাবে রোল করা হলে ব্যথা খুবই অল্প হবে এবং রক্তও ঝরবে না। ডার্মারোলারের আরো একটি ভালো দিক হলো এর ব্যবহার আপনাকে সারাজীবন ধরে চালিয়ে যেতে হবে না। সমস্যাগুলো দূর হওয়ার পর পরই আপনি এটি ব্যবহার করা বাদ দিতে পারেন।

সম্পাদকের বাছাই –

Leave a Comment