ড্রপবক্স কি? কিভাবে কাজ করে? কেনই বা ব্যবহার করবেন?

গুগল, মাইক্রোসফট ইত্যাদি আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ড্রপবক্সের মতো একই সার্ভিস দিয়ে থাকলেও, আমি ব্যাক্তিগত ভাবে সবসমই ড্রপবক্স ব্যবহারের পক্ষপাতি। আর আপনাকেও এটিই ব্যবহারের পরামর্শ দিব। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক, ড্রপবক্স কি? কিভাবে কাজ করে? আর ড্রপবক্সের সংক্ষিপ্ত কিছু ইতিহাস।

দৈনন্দিন জীবনের অনেক ফাইল কিংবা ছবি আমরা আমাদের ব্যবহৃত মেমোরিতে রাখতে পারি না। আবার অনেক সময় এটাও দেখা যায় যে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কিছু ফাইল কিংবা ছবি নিজের অজান্তেই ডিলেট করে বসেছি। এরকম জটিলতার মুখোমুখি আমাদের প্রায়ই হতে হয়। চিন্তা নেই, আজ আমরা আমাদের এই সার্বজনীন জটিলতা দূরীকরণের জন্য ইন্টারনেটের এমন একটি জনপ্রিয় সার্ভিস নিয়ে আলোচনা করবো যা আমদের এসব সমস্যা দূর করবে মূহুর্তেই। আর এই সার্ভিসটি হচ্ছে ড্রপবক্স।

ড্রপবক্স কি? Dropbox কিভাবে কাজ করে?

সহজ ভাষায়- ড্রপবক্স হল বেশ জনপ্রিয় একটি অনলাইন ফাইল হোস্টিং সার্ভিস। এটি মূলত একটি ক্লাউড ভিত্তিক স্টোরেজ সুবিধা যেখানে আপনি আপনার যাবতীয় ফাইল সমূহ সংরক্ষণ করতে পারবেন খুব সহজেই।

Dropbox আপনাকে তার সার্ভারের স্টোরেজে বিনামুল্যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা বরাদ্দ দিবে, যেখানে আপনি আপনার যেকোন তথ্য নিরাপদে রাখতে পারবেন। আর মজার ব্যাপার হল, এটিকে আপনি আপনার নিজস্ব হার্ড ড্রাইভের মতোই ব্যবহার করতে পারবেন।

অনলাইন ফাইল হোস্টিং সার্ভিস- ড্রপবক্স কি, সেটা তো জানলেন। কিন্তু ক্লাউড বেসড স্টোরেজ সম্পর্কে কি ধারনা আছে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে থাকুন।

ক্লাউড বেসড স্টোরেজ কি? (What is Cloud Storage)

আসলে ক্লাউড বেসড স্টোরেজ হলো ইন্টারেটের মাধ্যমে বা সরাসরি ইন্টারনেটেই আপনার তথ্য সংরক্ষণ করা। এক্ষেত্রে সংরক্ষণের জন্য একটি ডাটা ক্যাপাসিটি বা স্টোরেজের প্রয়োজন হয়। আর এই ডাটা ক্যাপাসিটি বা স্টোরেজ আপনি তৃতীয় পক্ষের কোনো অ্যাপ কিংবা সফটওয়্যার ব্যবহার করার মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। যার মধ্যে একটি হলো এই ড্রপবক্স। আশা করি ড্রপবক্স বিষয়টি আপনার বোধগম্য হয়েছে।

আরও পড়ুন –

কিভাবে হয়েছিল ড্রপবক্স (Dropbox) এর উৎপত্তি?

ড্রপবক্সের পিছনের ইতিহাসটা কিছুটা এমন ছিল-

ড্রপবক্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্রিউ হাটসন MIT এর ছাত্র থাকা কালে তিনি প্রায়ই তার USB Flash Drive টি ক্লাসে নিয়ে যেতে ভুলে যেতেন। বিষয়টা কিছুটা আপনার কিংবা আমার ঘটনার সাথেও মিলে যায়। কেননা আমরাও তো মাঝে মাঝে এমনই সমস্যার সম্মুখীন হই। তাই না?

যাই হোক, ড্রিউ হাটসন তার এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য নানান পথ খুঁজতে থাকেন। এরপর এক পর্যায়ে তিনি তার সমস্যার সমাধান পেয়েও যান। আর যখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান পেয়ে যান, তখন তিনি ভাবেন যে সমস্যাটা হয়তো সবার ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে ‌। আর তাই এই সমস্যা দূরীকরণের বাস্তবায়ন হিসাবে তিনি আবিষ্কার করেন ড্রপবক্স । যা বর্তমানে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

ড্রপবক্স এর জনপ্রিয় সব ফিচার

পৃথিবীর সেরা দশটি ক্লাউড স্টোরেজ সেবার মধ্যে ড্রপবক্স যে একটি তা আমাদের জানা। কিন্তু কেন ড্রপবক্সের এত জনপ্রিয়তা? উত্তর কিন্তু একটাই। আর তা হলো ড্রপবক্সের অসাধারণ সব সুবিধা ও ফিচার। আপনি যদি ড্রপবক্স ব্যবহার নাও করে থাকেন তবুও আমার দৃঢ় বিশ্বাস উক্ত সেবাগুলোর কথা শোনার পর আপনি আকৃষ্ট হবেন। কি সেই সেবাগুলো যা আপনাকে ড্রপবক্স ব্যবহারে আকৃষ্ট করবে? জানতে হলে সাথেই থাকুন।

ড্রপবক্স ফাইলের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে

ড্রপবক্সের সবচেয়ে বড় সুবিধার একটি হলো এটি আপনার ফাইলের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। জরুরী সব ফাইল গুলো এখানে রেখে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কেননা ডপবক্স এর মধ্যে আপনার সকল ফাইল পূর্ণ নিরাপত্তার অধীনে থাকে। তা হারানো কিংবা ডিলেট হওয়ার কোনো রকম সম্ভাবনাই নেই। আবার ড্রপবক্স থেকে আপনার তথ্যগুলো চুরি হয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই।

ড্রপবক্স যেকোন স্থান থেকেই ফাইল এক্সেসের সুবিধা দিয়ে থাকে

ধরুন,আপনি চট্টগ্রাম গিয়েছেন একটি জরুরী কাজের জন্য। কিন্তু ভুল করে কাজের ফাইলটিই বাসায় রেখে এসেছেন। এরকম পরিস্থিতিতে বাসায় পুনরায় ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, আপনার যদি একটি ড্রপবক্স অ্যাকাউন্ট থাকতো?

ড্রপবক্স অ্যাকাউন্ট থাকলে আপনি হয়তো ফাইলটি সেখানেই রাখতে পারতেন। আর যেখানেই যান না কেন সেখান থেকেই তার এক্সেস পেয়ে যেতেন, কষ্ট করে বাসায় আসতে হতো না। আর কষ্ট করে ল্যাপটপটিও বয়ে নিয়ে যেতে হতো না। যদিও এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৩টি ডিভাইস থেকেই আপনি এর এক্সেস নিতে পারবেন।

ড্রপবক্স সব ধরনের ডিভাইসেই সাপোর্ট করে

আপনি ফোন কিংবা ল্যাপটপ যাই ব্যবহার করেন না কেন ড্রপবক্স কিন্তু আপনার জন্য সব জায়গায় থাকছে। কেননা এটি অ্যান্ড্রয়েড থেকে শুরু করে পিসি কিংবা ল্যাপটপেও সাপোর্ট করে। আর ফোন থেকেই ল্যাপটপ আর ল্যাপটপ থেকে ড্রপবক্স -এ সেভ বা সংরক্ষণ করা ফাইল গুলোর এক্সেস করতে পারবেন। সত্যি কি অসাধারণ, তাই না? আর অফিসের ল্যাপটপে যদি কোনো ফাইল থেকে থাকে তা তো বাসায় বসেই দেখতে পারবেন।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে নিন –

ড্রপবক্স এ ইচ্ছামতো ফোল্ডার তৈরি করা সুবিধা

হ্যাঁ, ড্রপবক্স আপনাকে বিভিন্ন ফাইলের জন্য বিভিন্ন ফোল্ডার তৈরি করার সুবিধাটি দিয়ে থাকে। আর ড্রপবক্সের এই সুবিধাটির মাধ্যমে আপনার ফাইল্গুলো ফোল্ডার অনুযায়ী ভাগ ভাগ করে রাখতে পারেন।

সহজ কথায় বুঝতে গেলে মনে করুন, আপনি আপনার বিভিন্ন কাস্টমার এর জন্য একটি ফোল্ডার তৈরি করতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে একটি পাবলিক ফোল্ডার তৈরি করে তার লিংক বন্ধু কিংবা কাস্টমারদের সাথে শেয়ার করতে পারেন।

ড্রপবক্সের বড় কোনো ফাইল শেয়ার করুন লিংক শেয়ারের মাধ্যমে –

ধরুন,আপনি কাউকে একটি ফাইল পাঠাতে চাচ্ছেন ইমেইলের মাধ্যমে। কিন্তু এর সাইজ অনেক বড় হওয়ায় একটু চিন্তায় পড়ে গেছেন। এরকম হওয়াটা বেশ স্বাভাবিক। কেননা ইমেইলে তো ২৫ এমবি এর বেশি বড় ফাইল শেয়ার করা যায় না। এখন কি করবেন?

সমস্যা যেমন, সমাধানও তেমনি। হ্যাঁ, ড্রপবক্স এর মাধ্যমে উক্ত ফাইলের লিঙ্ক আপনি ইমেইলে আপনার বন্ধু কিংবা কলিগ এর সাথে শেয়ার করতে পারেন। আর এটি তিনি যেকোন স্থান থেকেই এক্সেস করতে পারবেন। এক্ষেত্রে লিঙ্কটি পাবলিক করতে হবে আপনাকেই।

ড্রপবক্স একটি নির্দিষ্ট লিমিট পর্যন্ত ফ্রি সেবা দিয়ে থাকে

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন ড্রপবক্স আপনাকে একটি নির্দিষ্ট লিমিট পর্যন্ত বিনামূল্য সেবা দিয়ে থাকে। ড্রপবক্স এর অন্যতম ও প্রধান সেবাগুলোর মধ্যে এটি একটি। যা সত্যি অনেক প্রসংশার দাবি রাখে। আর নির্দিষ্ট লিমিটটি কত জানেন? এটির বিনামূল্যে দেয়া পরিষেবায় আপনি পাবেন ফ্রি ২ জিবি স্পেস বা স্টোরেজ। যা রেফারেল প্রোগ্রামের মাধ্যমে আরো বাড়াতে পারবেন। সত্যি অকল্পনীয়, তাই না?

তবে এই ফ্রি সেবার বাইরেও কিন্তু আপনি অন্যান্য পেইড বা টাকা দিয়ে সেবাগুলো কিনে নিতে পারেন। এর জন্য আপনাকে মাসে কিছু টাকা তাদেরকে দিতে হবে। তবে সেই সেবাটিও অত্যন্ত জনপ্রিয় কেননা মাসে মাত্র ১৬ ডলারের বিনিময়ে আপনি ড্রপবক্স এর কাছ থেকে ৩ টেরাবাইট ফ্রি স্টোরেজ পেয়ে যাচ্ছেন। কখনো কি এতটা ভেবেছিলেন?

ড্রপবক্স শেয়ারকৃত ফাইলের পর্যবেক্ষণের সুবিধা দিয়ে থাকে

ফাইল পর্যবেক্ষণের সুবিধা অনেক উপকারী একটি পরিষেবা। কেননা আপনি নিশ্চয় চাইবেন আপনার ফাইলটিতে কে কি করছে বা কে কি করলো তা জানতে। আর আপনার এরকম একটি চাহিদার কথাটি মাথায় রেখেই ড্রপবক্স আপনার জন্য এই পরিষেবাটি নিয়ে এসেছে।

ওয়েবসাইট কিংবা ল্যাপটপের ব্যাকআপ করুন ড্রপবক্সে

আপনার ওয়েবসাইট কিংবা ল্যাপটপ এর যাবতীয় তথ্যাদি যদি আপনি কোনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে চান সেক্ষেত্রে ড্রপবক্স হতে পারে আপনার ভরসার কেন্দ্রস্থল।

কেননা ড্রপবক্স যেমন আপনাকে স্টোরেজ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে তেমনি আপনার তথ্যের নিরাপত্তাও দিয়ে থাকে। যা সত্যি অভাবনীয়। আর মাসে মাসে মাত্র ১৬ ডলার করে দেয়ার মাধ্যমে যদি ল্যাপটপের ১ টেরা বাইটের চেয়েও বড় জায়গা পেয়ে যান তবে ক্ষতি কি? আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

ড্রপবক্স নাকি গুগল ড্রাইভ?

ড্রপবক্সের বিকল্প হিসেবে আপনি হয়তো আপনার পরিচিত গুগল ড্রাইভের কথাই ভাববেন। মনে রাখবেন, গুগল ড্রাইভের চেয়ে ড্রপবক্সের সেবা ও পরিষেবা অনেক বেশি বলেই এটি এত জনপ্রিয়। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক ড্রপবক্স আর গুগল ড্রাইভের অভ্যন্তরিন কিছু পার্থক্য।

স্টোরেজ

গুগল ড্রাইভ আপনাকে ১৫ জিবি ফ্রি দিয়ে থাকে একটা ক্লাউড স্টোরেজের সাথে। যদিও সেখানে ইমেইল এবং অন্যান্য ফাইল গুলো সংযুক্ত থাকে, তারপরও এটি এক বিশাল স্টোরেজ। কিন্তু এন্ড্রয়েড ফোন আর ইমেইল যুক্ত থাকায় ১৫ জিবি খুব কম মনে হয় আমার কাছে।

এদিকে, ড্রপবক্সের স্পেস মাত্র ২ জিবি। কিন্তু আপনি হয়তো ড্রপবক্সের রেফালের প্রোগ্রামের কথা শুনে থাকবেন যেখানে একটা রেফারেলেই আপনি ৫০০ এমবি ফ্রি স্টোরেজ পেয়ে যাবেন। আর একটা ফ্রি অ্যাকাউন্টের জন্য মোট ৩২টা রেফালের সুবিধা থাকে ড্রপবক্স সেবায়। তার মানে দাড়াচ্ছে একটা ফ্রি অ্যাকাউন্টে অর্থাৎ ড্রপবক্স এ ফ্রি তে পাচ্ছেন মোট ১৮জিবি। এখন বলুন ড্রপবক্স নাকি গুগল ড্রাইভ ?

ফাইল সিঙ্কিং (Syncing)

আপনি যখন কোনো ফাইলে কাজ করেন আর সেটা অটোমেটিকভাবে সেভ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিই হল ফাইল সিঙ্কিং। এক্ষেত্রে গুগল ড্রাইভ ও ড্রপবক্সের মধ্যে অনেকটাই তফাৎ আপনি লক্ষ করবেন।

কেননা, গুগল ড্রাইভে কোনো ফাইল সিঙ্কিং এর ক্ষেত্রে পুরো ফাইলটা আপলোড কিংবা ডাউনলোড হওয়ার পর তা শুরু হয়। আবার মাঝে মাঝে আপনি কিছু এডিট করে থাকলে তা দেখার জন্য অ্যাপটি বন্ধ করে পুনরায় চালু করতে হয়। বিষয়টি মোটেও খুব সুবিধাজনক নয়।

কিন্তু ব্যাপারটিকে একেবারেই সহজ করে দিয়েছে ড্রপবক্স। কারণ, ড্রপবক্সের ফাইলে নতুন কিছু যোগ বা বিয়োগ করলে আপনি সেটা সরাসরিই দেখতে পারবেন। এজন্য বার বার অন-অফের কোন প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন, এমনটা শুধু ড্রপবক্সেই সম্ভব। আর এই কাজের ক্ষেত্রে ড্রপবক্স মূলত ব্লক সিঙ্কিং ব্যবহার করে থাকে। এরকমই আরো কিছু ফিচার রয়েছে যা ড্রপবক্সকে গুগল ড্রাইভ থেকে এগিয়ে রাখছে।

শেষ কথা

জনপ্রিয় ভার্চুয়াল স্টোরেজ ড্রপবক্সের অধিকাংশ (প্রায় ৩২.৭ শতাংশ) ব্যবহারকারিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তবে বাংলাদেশেও বেড়ে চলেছে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

আজকের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, জরুরী ফাইল সংরক্ষণে ড্রপবক্স ঠিক কতটা কার্যকরী। কাজেই আর দেরি না করে এক্ষুনি একটি ড্রপবক্স অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলুন এবং নিশ্চিত করুন আপনার সব ফাইল ও তথ্যের নিরাপত্তা।

সম্পাদকের বাছাই –

Leave a Comment