ত্বকের উজ্জ্বলতা ও তারুণ্যভাব ধরে রাখতে কার্যকর ৫টি খাবার

অনেক দামি দামি প্রোডাক্ট ব্যবহার করেও কি আশানুরূপ ফলাফল পাচ্ছেন না? রুটিন মেনে ত্বকের যত্ন নিচ্ছেন অথচ তা সত্ত্বেও ত্বক নির্জীব হয়ে যাচ্ছে? জানেন কি, ত্বকের বাহ্যিক যত্নের পাশাপাশি ভেতর থেকে যত্ন নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরী। তা না হলে যতোই ঘষামাজা করুন না কেনো, কোনো লাভই হবে না। বরং দিন দিন ত্বকের তারুণ্যভাব ও জেল্লা হারাতে থাকবে। তাই ন্যাচারালি সুন্দর থাকতে, ত্বকের উজ্জ্বলতা ও তারুণ্যভাব ধরে রাখতে কার্যকর খাবার -এর দিকে নজর দিন।

কিছু সুনির্দিষ্ট খাবার আছে যেগুলো নিয়মিত খেলে নানাবিধ রোগ থেকে মুক্তি লাভের পাশাপাশি ন্যাচারালি আপনি সুন্দর ত্বক পাবেন ও আপনার তারুণ্যভাব বজায় থাকবে।।

আজকের আর্টিকেলটি পড়ার মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন- তারুণ্যভাব ধরে রাখতে কার্যকর খাবার গুলোর বিষয়ে।

আকর্ষণীয় ত্বকের জন্য কি কি খাবার খাবেন? কখন খাবেন? সেসব কিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ

০১। ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতে গাজরের ব্যবহার

গাজর অতি পুষ্টিকর আঁশযুক্ত একটি সবজি। গাজর আমরা কাঁচা অবস্থায়, সালাদ করে, জুস বানিয়ে অথবা তরকারিতে দিয়ে খাই। তাই গাজরের সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। তবে এর গুনাবলি সম্পর্কে হয়তো সবাই অবগত নই।

গাজরে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, বিটাক্যারোটিন ইত্যাদি রয়েছে। গাজরের এতো গুনাবলির জন্য একে সুপার ফুড বলা হয়ে থাকে। এতে থাকা বিটাক্যারোটিন নিজেই রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভিটামিন-এ তে রূপান্তর হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

এগুলো আমাদের শরীরের নানা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। সুন্দর ত্বকের জন্য গাজরের উপকারিতা গুলো নিচে দেওয়া হলো-

১। ব্রণমুক্ত পরিষ্কার ত্বক পেতে গাজর– গাজরে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন রয়েছে যা ব্রণের জীবাণুর সাথে লড়াই করে ত্বককে রাখে পরিষ্কার।

আরও পড়ুন-

২। গাজর বলিরেখা দূর করে– সূর্যের আলোয় আমাদের ত্বকের অনেক ক্ষতিসাধন হয়। এছাড়াও বয়সের সাথে সাথে ত্বকে বলিরেখাও পরে। তখন ত্বকে দাগ পরে ও ত্বক অনুজ্জ্বল হয়ে যায়। নিয়মিত গাজর খেলে ত্বক এসব ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় এবং বয়সের ছাপ পরে না।

৩। গাজর ক্ষতিকর সূর্যরশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে– সূর্য রশ্মি আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে থাকে। যার কারণে মুখে ট্যান পরে। ত্বক কালচে হয়ে যায়। গাজরে থাকা বিটাক্যারোটিন ভিটামিনে রুপান্তর হয়ে সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে ত্বককে রক্ষা করে।

০৪। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে গাজর– গাজরে থাকা পটাসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে সতেজ রাখে। এতে থাকা বিটাক্যারোটিন রক্ত পরিষ্কার করে এবং ত্বককে উজ্জ্বল করে।

ত্বককে সবসময় সুন্দর, প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল রাখতে সকালে ঘুম থেকে উঠে গাজর ব্লেন্ড করে এক গ্লাস গাজর জুস খান। এটি আপনার ত্বককে সুন্দর করার পাশাপাশি আপনার দেহের বিভিন্ন ক্ষতিকর রোগ প্রতিরোধ করতেও সাহায্য করবে।

০২। ত্বকের উজ্জ্বলতা ও তারুণ্যভাব ধরে রাখতে হলুদের ব্যবহার

হলুদ আমাদের অতি পরিচিত নিত্য ব্যাবহৃত একটি মসলা। হলুদ শুধু খাবারে সুন্দর রঙ’ই আনে না, সাথে যোগ করে নানাবিধ পুষ্টি উপাদান। হলুদ একটি প্রাকৃতিক রক্ত পরিষ্কারক উপাদান।

এটি আমাদের রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থগুলো বের করতে সাহায্য করে। হলুদে অ্যান্টি-সেপটিক, অ্যান্টি-ইনফ্লেমটরি, অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-অ্যালার্জেটিক প্রপার্টিস রয়েছে; যা শরীরের নানা ধরনের রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে থাকে।

এছাড়াও এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমটরি উপাদান দেহের ইমিউনো সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। যার কারণে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

ঝলমলে উজ্জ্বল ত্বক পেতে হলুদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিন ১ গ্লাস হলুদ দুধ আপনার ত্বকের হারানো তারুণ্যভাব ফিরিয়ে আনবে। ত্বককে করবে আরো বেশি প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল।

কিভাবে বানাবেন হলুদ দুধ? রইলো, হলুদ দুধ বানানোর প্রস্তুত প্রণালী-

১। পাত্রে ১গ্লাস পরিমাণ দুধ নিন। অল্প আঁচে রান্না করতে থাকুন।
২। এবার ১ চা চামচ হলুদ বাঁটা বা হলুদ গুড়ো যোগ করুন।
৩। এবার যোগ করুন ২ চিমটি গোল মরিচ গুঁড়ো ও ১চা চামচ দারুচিনি গুড়ো (অপশনাল)।
৪। এবার ১চামচ মধু যোগ করুন। স্বাদ বাড়াতে ১চামচ ঘি ও যোগ করতে পারেন।

এবার সবগুলো উপকরণ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। বার বার বানানোর ঝামেলা পোহাতে না চাইলে একবার বেশি করে বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন। এটি ফ্রিজে ৫ দিন পর্যন্ত ভালো থাকবে।

এক্ষেত্রে খাওয়ার আগে গরম করে নিলেই হবে। হলুদের অসাধারণ উপকারিতাগুলো ভোগ করতে প্রতিদিন সকালে নাশতা করার আধঘন্টা আগে হলুদ দুধ পান করুন।

হলুদ দুধের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য ত্বককে কোমল ও উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। এবং বার্ধক্য রোধ করে মুখে তারুণ্যভাব আনে।

০৩। তারুণ্যভাব ধরে রাখতে কার্যকর খাবার হিসেবে কাঠবাদামের ব্যবহার

কাঠবাদাম ভিটামিন ও মিনারেলে ভরপুর একটি খাদ্য বীজ। সুন্দর ত্বক পাওয়ার সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে কাঠবাদাম। কাঠবাদামে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন-ই ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান আছে, যেগুলো নির্জীব কোষ মেরামত করে। যার ফলে চেহেরার তারুণ্য ফিরে আসে।

অনেকের ধারণা কাঠাবাদাম শুধু বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। তবে জানিয়ে রাখা ভালো কাঠবাদাম শুধু বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর জন্যই ব্যবহৃত হয় না। এটি আমাদের শরীরের নানাবিধ রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে ও ত্বককে সুন্দর করতেও সমানভাবে ব্যবহৃত হয়।

এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবার, প্রোটিন, ওমেগা থ্রি, ম্যাগনেসিয়াম এবং আরো অনেক পুষ্টি উপাদান। এগুলো আমাদের দেহের কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণ করে। শক্তি সঞ্চার করে। বুদ্ধি বৃদ্ধি করে। হার্ট সুস্থ রাখে। ক্যান্সার রোধ করে ও ত্বকের জেল্লা বাড়ায়।

কাঠবাদামে প্রাকৃতিক তেল রয়েছে, যা আমাদের ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে। এতে থাকা ভিটামিন-ই ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও স্কিন সেল ড্যামেজ ও সানবার্ন হওয়া থেকেও পরিত্রাণ দেয় এটি।

ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ও সুন্দর ত্বকের অধিকারী হতে নিয়মিত ৫-১০টি কাঠবাদাম খান। এতে ত্বক সুন্দর থাকার পাশাপাশি আপনার শরীরও সুস্থ থাকবে।

যেভাবে কাঠবাদাম খাবেন-

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটি পাত্রে ৫-১০ টি কাঠবাদাম ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঠবাদামের খোসা ছারিয়ে খেয়ে ফেলুন। কাঠবাদাম খোসা সহ’ও খাওয়া যায় তবে খোসা ছাড়িয়ে খেলে দ্বিগুণ উপকার পাওয়া যায়।

পড়ুন- নিয়মিত বাদাম খাওয়ার ১২টি উপকারিতা

০৪। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে প্রাত্যহিক খাবার তালিকায় একটি ডিম রাখুন

ডিমে অনেক পুষ্টি আছে, ডিম শক্তি বাড়ায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কথাগুলো তো আমরা অহড়হ শুনে থাকি। তবে এটা জানতেন কি, ডিমের সাথে সৌন্দর্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে!

ডিম কিভাবে ত্বক উজ্জ্বল করতে সহায়তা করে সেটা জানার আগে চলুম জেনে নেওয়া যাক- ডিম আসলেই আমাদের শরীর ও ত্বকের জন্য কতোটা জরুরী।

১। একটি ডিমে ৬.৩ গ্রামের মতো প্রোটিন পাওয়া যায়। যা খুব সহজেই দেহে শোষিত হয়ে দেহের গঠন ও ক্ষয়পূরণ করে। এছাড়াও এই উচ্চমানের প্রোটিন আমাদের চুল ও ত্বকের টিস্যু পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

২। ডিমে থাকা আয়রন শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে সেটাও দূর করে।

৩। ডিমে রয়েছে ভিটামিন-এ। ভিটামিন-এ আমাদের চোখ ও ত্বকের কোষ সুস্থ রাখে।

৪। ডিমে আছে ভিটামিন-ই। যা আমাদের শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন-ই স্বাস্থ্যউজ্জ্বল ত্বক ও চুল পেতে সাহায্য করে।

৫। ডিমে থাকা ভিটামিন-বি১২ হৃদরোগ কমায় এবং হার্ট সুস্থ রাখে।

এছাড়াও ডিমে রয়েছে ফলেট, সেলেনিয়াম, সালফার, কোলেস্টেরল, কোলিন ইত্যাদি। ডিমে থাকা সালফার কোলাজেন উৎপাদন করে। যা আমাদের ত্বককে টান ও উজ্জ্বল করতে সহায়তা করে।

অনেকের কাছে ডিমের কুসুম ভালো লাগে না। তবে এটিও খাওয়া উচিত। এতে থাকা ভিটামিন-ই ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল করে থাকে। সকালের নাশতায় নিয়মিত একটি ডিম আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার পাশাপাশি ত্বককে উজ্জ্বল করবে।

০৫। ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিত শসার কার্যকারিতা

শসা আমাদের অতি পরিচিত একটি সবজি। এটি আমাদের শরীরকে ঠান্ডা ও সতেজ রাখতে সহায়তা করে। শসার প্রায় ৯০% ই পানি। শসাতে রয়েছে ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-৫, ভিটামিন-বি৭, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে, পটাশিয়াম, কপার, সালফার ইত্যাদি। শসা আমাদের সূর্যের বেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা করে। এটি আমাদের দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।

চোখের ফোলাভাব, মুখের কালো দাগ ও মুখের রোদে পোড়াভাব দূর করে। শসাতে থাকা ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে ও ক্যাফিক এসিড ত্বককে কোমল, মসৃণ ও উজ্জ্বল করে।

পড়ুন-

দাগহীন উজ্জ্বল ত্বক পেতে শসার জুরি নেই। খেয়াল করে থাকবেন, বিভিন্ন সাবান, ফেসওয়াশ, ক্রিম, ফেইসপ্যাক ও নামি দামি বিউটি পার্লারে গুরুত্বের সাথে শসা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মূলত এর মধ্যে থাকা একাধিক পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কারণেই এতে এতো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শসা আমাদের ত্বকের কোষগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। ফলে সহজে মুখে বয়সের ছাপ পরে না। ত্বক দেখায় প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল।

ত্বকের উজ্জ্বলতা ও তারুণ্যভাব ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিন একটি করে শসা খান। শসা আপনি সালাদ বানয়ে খেতে পারেন বা জুস বানিয়ে সাথে ১চামচ মধু দিয়ে অথবা সাধারণ অবস্থায়।

এটা খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে যখন বেশি ক্ষিধে পায় সে সময় জাঙ্ক ফুড না খেয়ে শসা খান। এতে করে হেলদি ও গ্লোয়িং স্কিনের অধিকারী হতে পারবেন।