দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উপায় – ৮টি সহজ কৌশল

অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন দুটোই অসুস্থতার কারণ। স্বাভাবিক প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজনকে আন্ডারওয়েট সমস্যা বলে চিহ্নিত করা হয়। আন্ডারওয়েট মানুষদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম থাকে। ফলে তারা নানাবিধ রোগে জর্জরিত থাকেন। আর তাছাড়াও অস্থিমজ্জা বের হয়ে যাওয়া, রুগ্ন, পাতলা, কম ওজনের মানুষ দেখতেও ভালো লাগে না। তাই অধিকাংশেরই ইচ্ছা থাকে মোটা হওয়ার কিন্তু দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উপায় ও গাইডলাইনের অভাবে তা হয়ে উঠে না।

অসাধু ডাক্তার ও অজ্ঞ মানুষের পাল্লায় পরে দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উপায় হিসেবে ওজন বাড়াতে অনেকেই অনেক রকমের ঔষধ ট্রাই করে থাকেন, যেগুলো নিঃসন্দেহে শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

ওজন বাড়ানোর ঔষধ শরীরের কতোটা ক্ষতি করে তার এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক –

ওজন বাড়ানোর ঔষধ খাওয়ার ফলে শরীরে পানি জমে। ঘাড়ে চর্বি জমে। হাত পা মুখ ফুলে যায়। দেহের সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে বাড়ে রক্তচাপ। দেহের প্রয়োজনীয় পটাসিয়াম ও ক্যালসিয়াম কমে যায়।

মাংশপেশীর দুর্বলতা দেখা দেয়। দেখা দেয় খিঁচুনি ও হাঁড়ক্ষয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের দাড়ি-গোফ উঠে! ঘা শুকাতে দেরি হয়। চোখে ছানি পড়ে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ইত্যাদি নানারকম সমস্যায় ভুগতে হয়।

সাময়িক ওজন বাড়ানোর ঔষধ খেয়ে আর্থিকভাবে যেমন ক্ষতির স্বীকার হবেন, ঠিক তেমনি শারীরিকভাবেও। তাই ওজন বাড়ানোর ঔষধকে না বলুন। বেছে নিন স্বাস্থসম্মত কৌশল।

আরও পড়ুন –

দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উপায় হিসেবে যে খাবারগুলো খেতে হবে

প্রতিদিন যে খাবারগুলো খান সেগুলোর দিকে একটু মনোযোগী হলে খুব সহজেই ওজন বাড়াতে পারবেন।

১। কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার

দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উপায় হিসেবে কার্বোহাইড্রেডযুক্ত খাবার খান
Photo by Sigmund on Unsplash

ওজন বৃদ্ধিতে কার্বোহাইড্রেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যারা মোটা হতে চাচ্ছেন তারা অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যাতে শরীর সঠিক মাত্রায় নিয়মিত কার্বোহাইড্রেট পায়। শরীরকে কার্বোহাইড্রেট দিতে হলে নিয়মিত খেতে হবে- শাকসবজি, শস্যদানা, ফলমূল, দুধ, স্টার্চ, ফাইবার, সুগার, ইত্যাদি।

ভাত ও রুটি হচ্ছে কার্বোহাইড্রেটের প্রধান উৎস। দিনে দুইবার খেতে হবে রুটি অথবা ভাত। তবে তিনবার না খাওয়াই ভালো। কারন অতিরিক্ত ফ্যাটের ঝুঁকি থাকে । দু’বেলা ভাত অথবা রুটি খাবেন আর একবেলা ১ প্লেট সবজি ও ফল। কার্বোহাইড্রেট খাবেন সাধারণ যতোটুকু খান, তার থেকে কিছুটা বেশি তবে অতিরিক্ত নয়।

২। ড্রাই ফ্রুটস

ড্রাই ফ্রুটস বা শুকনো ফলকে ওজন বাড়ানোর আদর্শ খাবার বলা হয়। ড্রাই ফ্রুটসে ক্যালরির মাত্রা বেশি থাকে যা দ্রুত ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে । ড্রাই ফ্রুটস হলো – কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, আখরোট, খেজুর, কিসমিস ইত্যাদি। সকালে খালিপেটে ১২/১৫টি বাদাম, কিসমিস, খেজুর একত্রে খাবেন। এর ৫/১০ মিনিট পর খাবেন ১ গ্লাস পানি। এতে করে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে এবং এক্টিভ থাকতে পারবেন সারাদিন। সাথে শরীরের ওজনও বৃদ্ধি পাবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্ষিদে পেলে এটা ওটা অস্বাস্থ্যকর খাবার না খেয়ে বাদাম খেয়ে নিবেন। এতে করে শরীর ক্যালরি পাবে ও দ্রুত ওজন বাড়বে।

৩। দুধ

দুধে থাকা প্রোটিন শরীরের ওজন বাড়ায়। তাই মোটা হওয়ার মিশনে নামলে খাবারের তালিকায় দুধ রাখা অত্যাবশকীয়। ১ চামচ মধু ও ২টি কিসমিস মাঝখানে কেটে সেগুলো ১ গ্লাস দুধে ভিজিয়ে ১০ মিনিট পর পান করুন। দুধ পান করার সঠিক সময় হলো সকাল বা দুপুর। এ সময়ে দুধ পান করলে এতে থাকা প্রোটিন ও মিনারেল পেশির ভর বৃদ্ধি এবং টিস্যুগুলোর মেরামতের সুযোগ পায়। ওজন বাড়াতে প্রতিদিন সকাল বা দুপুরে মধু ও কিসমিস মেশানো দুধ পান করুন।

৪। ডিম

ওজন বাড়াতে ডিম অনেক জনপ্রিয়। ডিমে থাকা গুড ক্যালরি, প্রোটিন ও চর্বি শরীরের ওজন বাড়াতে সহায়ক। প্রতিদিন সকালের নাশতায় ২-৩ টি ডিম খেলে দ্রুত ওজন বাড়বে। তাই ওজন বাড়াতে নিয়মিত অন্ততপক্ষে ২টি করে ডিম খাওয়া শুরু করে দিন। তবে আধ সেদ্ধ ডিম নয়, খেতে হবে সম্পূর্ণ সেদ্ধ ডিম। ওজন বাড়াতে কুসুম পরিহার করা শ্রেয়। প্রতিদিন ২-৩ টি করে ডিম খেলে ২ মাসেই সুফল পাবেন।

৫। আলু

আলুতে রয়েছে পূর্নমাত্রায় কমপ্লেক্স সুগার ও কার্বোহাইড্রেট, যেগুলো ওজন বৃদ্ধিতে খুবই প্রসৃদ্ধ। ওজন বৃদ্ধি করতে নিঃসন্দেহে আলু বেছে নিতে পারেন। তবে শুধু আলু খেলে ততোটা লাভবান হবেন না। আলু পাতলা পাতলা পিস করে ডুবো সয়াবিন তেলে ভেজে উপরে কিছুটা ঘি অথবা মাখন দিয়ে খেতে পারেন। এটা কিছুটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো। তবে সম্ভব হলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইও করে খেতে পারেন। এটা আপনার জন্য স্ন্যাকসের মতো কাজ করবে। কোনো ঘাটতি না দিয়ে প্রতিদিন আলু ভাজা বা আলুর চিপস খান। এতে করে খুব দ্রুত ওজন বাড়বে।

৬। ভাতের মাড়

আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। ভাত কমবেশি সবার বাড়িতেই রান্না হয়। ভাত রান্নার পর যে পানিটা ছেঁকে ফেলে দেওয়া হয় মুলত সেটাই মাড়। ভাত রান্নার পর আজ থেকে এই উপকারী তরলটা ফেলবেন না। এক গ্লাস খাবেন দুপুরের খাবার খাওয়ার ২-৩ ঘন্টা পর। আরেক গ্লাস রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে। তবে যারা ইলেক্ট্রিক কুকারে রান্না করেন তাদের ক্ষেত্রে ভাতের মাড় পাওয়া সম্ভব না। তবে আপনারা একমুঠো চালে ৪-৫ গ্লাস পানি দিয়ে রান্না করে নিবেন। ভাত সম্পূর্ণ না গলা পর্যন্ত নাড়তে থাকবেন। যে তরলটা বের হবে, সেটা মাড়ের চেয়ে দ্বিগুণ কাজ করবে। অনায়াসে ওজন বাড়াতে প্রতিদিন ১-২ গ্লাস ভাতের মাড় খান।

৭। পনির ও ঘি

পনির উচ্চ ক্যালরিযুক্ত একটি খাবার। ওজন বাড়াতে পনির খুবই সহায়ক। দুধ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এতে থাকে প্রোটিন, চর্বি, ক্যালসিয়াম, কোলেস্টেরল ইত্যাদি। তাই নাশতায় রুটি বা পাউরুটি অথবা বিস্কুটের সাথে পনির মিশিয়ে সকাল-বিকাল ২-৩ পিস করে খান। এতে করে খুব দ্রুত ওজন বাড়বে। দ্রুত ওজন বাড়াতে পনিরের জুড়ি নেই। ঘি পনিরের মতোই কার্যকর। ঘি দিয়ে রুটি ভেজে অথবা রান্নায় তেলের বিপরীতে ঘি দিয়ে রান্না করা খাবার খেতে পারেন।

৮। ফল

কিছু ফল আছে যেগুলো নিয়মিত খেলে শরীরের পুষ্টি যোগানের পাশাপাশি ওজনের বৃদ্ধিও ঘটে। যেমনঃ-

কলা

কলায় রয়েছে ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেট। মাংশপেশি তৈরিতে এই পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ ফলটি বিশেষ ভুমিকা পালন করে। নিয়মিত দই, কলা, ওটমিল একসাথে খেলে দ্রুত ওজন বাড়ে। তাছাড়াও প্রতিদিনের ব্রেকফাস্টে রাখতে পারেন একটি করে কলা। এতেও খুব উপকার পাবেন।

আম

আম স্বাদে যেমন অতুলনীয়, তেমনি পুষ্টির দিক থেকেও সেরা। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ভিটামিন ই, ইত্যাদি। পাঁকা আমে থাকে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ যা শরীরে ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বাড়ায় এবং ওজন বৃদ্ধি পায়। তাই যারা ওজন বাড়াতে চান খাদ্যতালিকায় আম রাখুন।

নারিকেল

সুস্বাদু এই বারোমাসি ফলটি নিয়মিত খেয়ে খুব সহজেই ওজন বাড়াতে পারেন। এতে রয়েছে কপার ও ফসফরাসের মতো উপকারী খনিজ। কার্বোহাইড্রেটসহ প্রচুর পরিমানে ফ্যাট ও ক্যালরি।

ওজন বৃদ্ধিতে খাদ্যাভ্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আপনার শারীরিক গঠন কেমন হবে, তা নির্ভর করে কোন ধরনের ও কি পরিমাণ খাবার আপনি খাচ্ছেন। ওজন বাড়ানো যাদের লক্ষ্য তারা অবশ্যই উপরোক্ত খাবারগুলো খাবেন। এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় নজর দিতে হবে, তা হলো ঘুম। ঘুম ওজন বৃদ্ধিতে খুবই বড়সড় প্রভাব ফেলে। তাই খেয়াল রাখবেন নিয়মিত ৮ ঘন্টা ঘুম হচ্ছে কি না। তবে ৮ ঘন্টার চেয়ে বেশি যেনো না ঘুমিয়ে পরেন সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ অতিরিক্ত ঘুম বা কম ঘুম অসুস্থতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি।

এক দিন কম আরেক দিন গলা ডুবিয়ে খেলে ওজন বাড়বে না। খেতে হবে সাধারণত যতোটুকু খান তার থেকে কিছুটা বেশি, তবে নিয়মিত। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে যে খাবারগুলো খাদ্য তালিকায় রাখবেন, সেগুলো হল- গরুর মাংস, ডিম, দুধ, মাখন, ঘি, রুটি ও ভাত, শুকনো ও তাজা ফল, শাকসবজি; যেমন- পেঁপে, কাঁচা কলা, মিষ্টি কুমড়া, প্রভৃতি।

সম্পাদকের বাছাই –

Leave a Reply