পবিত্র রমজান মাসের ফজিলত – করণীয় ও বর্জনীয়

আরবি মাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা ফজিলত পূর্ণ মাস হচ্ছে রমজান মাস। পবিত্র কুরআন শরিফ নাজিল হয় এই রমজান মাসে, যা এর মহত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। বলা আছে যে, এই মাসে কোনো নেকীর কাজ করলে আল্লাহ তার ৭০ গুন বেশি সোয়াব দেন। যেমন, এক রাকাত নামাজে ৭০ রাকাত নামাজের সোয়াব।

এখন চলছে আল্লাহ তায়ালার এই বরকত পূর্ণ মাস। এই মাস সম্পর্কে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রোজার মাস পেল কিন্তু তার গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে ধ্বংস হোক!” এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এই মাসটা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও এই মাসে অতীত জীবনের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া কতটা জরুরী।

এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ উল্লেখ হিসেবে বুখারি শরিফের এক বর্ণনায় রয়েছে, একদিন নবীজি (সা.) মিম্বরের সিঁড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন আমিন। পরের সিঁড়িতেও পা রেখে বললেন, আমিন। তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখে আবারও বললেন আমিন। হঠাৎ করে কোন কারন ছাড়াই এভাবে করুন সুরে বার বার আমিন বলার কারন জানতে চায় তার সাথে থাকা সাহাবীরা।

মলিন মুখে নবীজি বললেন, আমার প্রিয় সাহাবিরা! একটু আগেই জিবরাইল এসেছিল আমার কাছে। বড় বেদনার কথা বলে গেল সে। বলল, হে আল্লাহর নবী! তিন পোড়া কপালের জন্য এখন আমি বদদোয়া করব, প্রতিটি দোয়া শেষে আপনি আমিন বলবেন।

তারপর নবীজি বলেন, আমি যখন প্রথম সিঁড়িতে পা রাখি, জিবরাইল বলল, বৃদ্ধ বাবা-মাকে পেয়েও যে জান্নাত অর্জন করতে পারল না তার জন্য ধ্বংস। আমি বললাম, আমিন। দ্বিতীয় সিঁড়িতে যখন পা রাখি, জিবরাইল বলল, যে আপনার নাম শুনবে কিন্তু দরুদ শরিফ পড়বে না, তার জন্য ধ্বংস। আমি বললাম, আমিন। আর যে রমজান মাস পাবে কিন্তু নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নিজেকে জান্নাত উপযোগী মানুষ বানাতে পারবে না, তার জন্যও ধ্বংস। তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখার সময় এ দোয়া করল জিবরাইল। আমি বললাম, আমিন।

এই মাসটা যেমন বরকতময় মাস, তেমনি এই মাসে নিজেকে পাপমুক্ত করাও আমাদের জন্য অনেক জরুরী। আমরা রোজার মাস এলে সবাই কমবেশি মসজিদ মুখী হই এবং ভাবি আস্তে আস্তে নিজেকে একদিন সময় নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে, কান্নাকাটি করে একেবারে পাপ মুক্ত করে ফেলবো।

কিন্তু অলসতার জন্য কিংবা ধোঁকায় পরেই হোক না কেন, আমরা হঠাৎ উপলব্ধি করি, রোজা প্রায় শেষ কিন্তু আমরা এখনও আল্লাহর কাছে ক্ষমাই চাইনি ঠিকমত। এরকম ভাবে শয়তানের ধোকায় পরা থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

রোজার মাস এলে যেসব কাজকর্ম ছেড়ে আমাদের নিজেদের সংযত রাখা উচিত

রোজার মাস মানেই সংযমের মাস। সংযম রাখার মানে শুধু এটাই নয় যে সারাদিন না খেয়ে থাকা! রোজা শুধু পেটেরই নয়, চোখ, নাক, কান, মুখ ইত্যাদি সকল অঙ্গের রোজা রাখা।

রোজার মাসে আপনাকে চোখ দিয়ে অশ্লীল জিনিস দেখা হতে বিরত রাখতে হবে। আপনি আপনার নাক দিয়ে ঘ্রাণ কিছু নিতে পারবেন না, যা আপনার মনের অবস্থা পরিবর্তন করতে পারে। এছাড়াও শরীরের সকল অঙ্গকে এভাবে সংযত করতে হবে আপনাকে।

রোজার মাসে দিনের বেলা রাস্তার পাশে থাকা রেস্টুরেন্ট, হোটেল এসব বন্ধ রাখা জরুরি। নাচ-গান করার মত নিকৃষ্ট কাজে এই মাসে কোন ভাবেই লিপ্ত হওয়া যাবে না।

জুয়া খেলা, মদ্য পান করা এসব ইসলামে সবসময়ই হারাম। তবে কেউ যদি এসব কাজ করে তবে তার রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কারন জুয়ার টাকা ভক্ষন করা, মদ্য পান করলে ৪০ দিন শরীর নাপাক থাকে।

রোজার মাসের ফজিলত

রমজান মাস হচ্ছে সবচেয়ে ফজিলত পূর্ণ মাস। হাদিসে এসেছে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন রোজাদার ব্যক্তির পুরষ্কার তিনি নিজ হাতে দিবেন (বুখারি -১৯০৪)।

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি রোজা রাখবে জাহান্নাম তার জন্য ৭০ বছর দূরে চলে যাবে’।

  • রোজা রেখে মুখ ব্রাশ করার কোন নিয়ম নেই, এতে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়ে সুগন্ধি আসে। সুগন্ধি রোজা মাকরূহ করে। এই প্রসংগে আল্লাহ বলেন ‘আমার কাছে রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধ মেশকের চেয়েও সুঘ্রাণময়’।

বলা আছে, যে ব্যক্তি পূর্ণ ইমানের আশায় রোজা রাখবে আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।

এই মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদরের রাত। এই রাত কে ঘোষণা করা হয়েছে হাজার বছরের চেয়েও উত্তম রাত হিসেবে। যে ব্যাক্তি এ রাতের কল্যান থেকে যে বঞ্চিত হলো, সে যেন সকল কল্যান থেকেই বঞ্চিত হলো। এই রাতটা বান্দার গুনাহ মাফ করানোর জন্য এক উত্তম রাত।

এই মাসে একটি নফল ইবাদত করার মানে হচ্ছে একটি ফরজ ইবাদতের সোয়াব ও একটি ফরজ ইবাদত করলে ৭০ টি ফরজ ইবাদতের সোয়াব পাওয়া যায়। এছাড়াও এই মাসে ১ টাকা দান করলে তা ৭০ টাকা দানের সোয়াব পাওয়া যায়।

অনেকে একটি ভ্রান্তি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। তা হচ্ছে যেহেতু সোয়াব করলে ৭০ গুন বেশি পাওয়া যায় এই মাসে তাই গুনাহ করলেও ৭০ গুন বেশি পাপ লেখা হয়। তবে এরকম কোন কথা হাদিস বা কুরআনে উল্লেখ নেই।

রোজার মাসে যেসব কাজ বেশি বেশি করে করণীয়

রমজান মাসে যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত কুরআন শরীফ পাঠ করা। সাহাবীরা রোজার মাসে অনেক বেশি কুরআন শরীফ পড়তেন। এমনও হত তারা প্রায় ৩-৪ দিনে এক খতম কুরআন পড়ে ফেলতেন।

রোজার মাসে যত বেশি সম্ভব দান ছদকা করা উচিত। এই মাসে যাকাত দান করা ফরজ। যেসব মুসলিমদের সাড়ে সাত তোলা স্বর্ন বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রৌপ্য বা এই পরিমান ধন সম্পদ থাকে তাদের সম্পত্তির ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে দান করা ফরজ।

ইতিকাফে বসা: একটি নির্দিষ্ট এলাকায় রোজার মাসের শেষ দশ দিন অন্তত একজন ব্যক্তির ইতিকাফে থাকা আবশ্যক। যদিও ইতিকাফে যেকোন সময়েই বসা যায় তবে শেষ ১০ দিনে বসতে বলার প্রধান কারন হচ্ছে উক্ত সময়ে লাইলাতুল কদর চলে আসে। তাই এরকম তাৎপর্য পূর্ণ এক রাতের কারনে শেষ ১০ দিনে ইতিকাফে বসা উত্তম। আমাদের প্রিয় নবী সবসময়ই শেষ ১০ দিন ইতিকাফে বসেছেন।

শবে কদরের সময়/লক্ষণ: আমাদের দেশে ২৭ রোজাকে শবে কদর হিসেবে নির্দিষ্ট করে নামাজ পড়া ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ইসলামের ভাষ্যমতে শবে কদরের নির্দিষ্ট কোন দিনক্ষণ নেই। অর্থাৎ সেটা নাজাতের শেষ ১০ দিনে যেকোন বিজোড় রাতেই হতে পারে।

হজরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) কে শবে কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন যে, তা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রে অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখে বা রমজানের শেষ রাতে হয়। যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় দাঁড়ায় তার অতীতের যাবতীয় গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

তবে শবে কদরের কিছু লক্ষণ রয়েছে। সেসব হচ্ছে ‘রাত টা নির্মল হবে, রাত টি ঠান্ডা বা গরম হবে না, রাতটা চাঁদনী রাতের মত মনে হবে, ওই রাতে তারা গুলো ছোটাছুটি করে না’। যে রাতে এরকম লক্ষণ গুলো দেখা যাবে ধরে নিতে হবে সে রাতে শবে কদর হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। তবে আমাদের প্রিয় নবী নির্দিষ্ট দিনে শবে কদরের আশায় না থেকে বিজোড় দিনগুলোয় শবে কদর খুঁজতে বলেছেন। তাই সবারই উচিত বেশি বেশি এই মাসে বেশী বেশী করে আমলে মশগুল হওয়া, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা চাওয়া।