এই প্রজন্মের সেরা ক্রিকেটার বিরাট কোহলি

বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার কে? কেউ বলবে মেসি কেউবা রোনালদো! কিন্তু যদি প্রশ্ন টা হয় ক্রিকেটে, কে বিশ্বসেরা? তাতে মনে হয়না খুব একটা দ্বিমত আসবে বিরাট কোহলির নাম নিয়ে। আচরণের জন্য তাকে অনেকে পছন্দ না করলেও ক্রিকেটার হিসেবে তিনি যে সেরা তাতে কারোরই সন্দেহ থাকার কথা নয়, উচিত নয়।

একজন কোহলিকে কিভাবে বর্ননা করা উচিত? শুরুটা করা যাক তার এভারেজ দিয়েই।

আপনি জানেন কি ক্রিকেট ইতিহাসে কতজন খেলোয়াড়ের গড় ৫০+ এক ফরম্যাটে?

সংখ্যাটা ৫০ ছাড়িয়ে!

ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র ৩ জন ক্রিকেটারের গড় ২ ফরম্যাটে ৫০+ এভারেজ।

আর ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র একজন ক্রিকেটারের এভারেজ ৩ ফরম্যাটেই ৫০+ আর তিনি হচ্ছেন বিরাট কোহলি!

একটা মানুষের ধারাবাহিকতা কতটা বেশি থাকলে ৩ ফরম্যাটে এভারেজ ৫০ এর উপরে হতে পারে তা বোধহয় এই কোহলিকে না দেখলে বুঝা যেত না।

আজকের বিশ্বসেরা কোহলি হয়ে ওঠার অতীতটা এত সহজ ছিল না। জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে করেছেন অনেক স্ট্রাগল। ছোটবেলায় মাত্র ১৮ বছরে হারিয়েছিলেন বাবাকে! বাবার মৃত্যু যতটা তার জীবন এলোমেলো করে, ঠিক ততটাই ক্রিকেটার হতে সাহায্য করে তোলে!

শুনে অবাক লাগছে? হ্যা লাগারই কথা। কারন সেদিন ১৮ ডিসেম্বরে যখন তার বাবা মারা যায়, তখন তিনি তার স্বপ্ন আর ধ্যান পুরোটাই চিন্তা করেন ক্রিকেট নিয়ে। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে যে!

বাবার স্বপ্ন ছিল ছোট্ট বিরাট ভারতের জাতীয় দলে খেলবে। সেই স্বপ্নের সব কিছু ঠিকমতই এগুচ্ছিল। সব শ্রেণীর বয়স ভিত্তিক দলেই জায়গা হচ্ছিল বয়সের তালে তালে। তবে যেদিন সে পুরো লাইমলাইট কেড়ে নেয়, সেদিন ছিল ১৮ ডিসেম্বর ২০০৬ সাল, তার বাবার মৃত্যুর দিনে।

একদিন আগে তামিল নাডুর বিরুদ্ধে দিল্লি মুখোমুখি হয় ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ম্যাচে। ১৮ তারিখ প্রথম দিনের খেলা শেষে কোহলি অপরাজিত থাকেন ৪০ রান করে। ওই রাত ৩ টায় স্ট্রোক করে মারা যান তার বাবা প্রেম কোহলি।

সবাই যখন ধরে নেয় কোহলি বিদায় নিবে, তখন সবাই কে অবাক করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন খেলার! বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে যে!

সেদিন ব্যাট করতে নেমে যোগ করেন আরও ৫০ রান। শেষ পর্যন্ত লেগ বিফোরের ফাদে পরে ৯০ রান করে আউট হন। মাঠের বাইরে গিয়ে যখন কাঁদতে শুরু করলে তার কোচ তাকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে যে, ‘কান্না করো না বিরাট, আমরা তো আছি। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে!”

তখন বিরাট কোহলির দেয়া উত্তর শুনলে আপনি চমকে উঠবেন। সে বলেন ‘আমি বাবার মৃত্যুর কথা ভেবে কাঁদছি না। আমি কাঁদছি কারন বল আমার ব্যাটে লেগেছে, কিন্তু তারপরেও আমাকে আউট দেয়া হয়েছে।”

অবিশ্বাস্যই বটে!

আউট হওয়ার পর ড্রেসিংরুম থেকে সরাসরি বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে চলে যান।

তার ১৮ নাম্বার জার্সির গল্প জানেন? বাবার মৃত্যুর দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি ১৮ নাম্বার জার্সি পরেন।

যখন ২০০৮ সালে ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দল তাকে ক্যাপ্টেন করে বিশ্বকাপ খেলতে পাঠায়, সেবার ফাইনালে আফ্রিকাকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত।

বিশ্বকাপ জিতে আসার পরই যেন হঠাৎ বদলে যায় তার জীবন। সেবারই প্রথম আইপিএল আসরে ডাক পায় কোহলি। মাত্র ২০ লাখ রূপিতে তাকে কিনে নেয় রয়্যাল চ্যালেঞ্জারস ব্যাঙ্গালোর।

সেবারের আইপিএলের পর জাতীয় দলেও ডাক পান তিনি। হঠাৎ করেই যেন তারকা খ্যাতি চলে আসে তার মধ্যে, যা হয়ে দাঁড়ায় তার ক্ষতির কারন।

হঠাৎ করে এত কিছু পেয়ে নিজেকে সামাল দিতে পারেনি। ক্যারিয়ারের প্রথম সিরিজে ছিলেন প্রায় সুপার ফ্লপ। পরের সিরিজেই বাদ পরেছিলেন জাতীয় দল থেকে।

তখনই সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে পরিবর্তন করার। তাতে আবার পরের বছর জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে আর ভুল করেননি তিনি। অভিষেক হওয়া দল সেই শ্রীলংকার বিরুদ্ধে আবার খেলতে নেমে তুলে নেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি।

ভালো খেলেও বাদ পরেন। কারন দলে ফিরে আসে সিনিয়র ক্রিকেটাররা।

সময়টা ২০১০। এবার আর পিছনে ফিরে তাকানো লাগেনি তার। অপেক্ষা করা লাগেনি কারও ইঞ্জুরির। সরাসরি দলেই জায়গা পেয়ে যান তিনি। ২০১০ সালে ভারতের এত এত তারকাদের ভীরে ওয়ানডেতে তাদের হয়ে বছর শেষে সর্বোচ্চ রান করেন কোহলি।

২০১১ বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন বাংলাদেশের সাথে। ২০১১ তে বিশ্বকাপ জিততে অবদান রাখেন তিনি। ফাইনালে প্রয়োজনীয় মূহূর্তে ৩৫ রান করেন, যা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস।

২০১২ সালে ট্রাই সিরিজে ভারতের অবস্থা দাঁড়ায় এমন যে যদি ৪০ ওভারের মধ্যে তারা ম্যাচ জিতে তবে বোনাস এক পয়েন্ট নিয়ে ফাইনাল খেলার সুযোগ থাকবে, নয়ত তাদের বিদায়। সেই ম্যাচে তাদের টার্গেট দাঁড়ায় ৩২১ রান! ওই ম্যাচ ৩৭ ওভারে শেষ করেন বিরাট কোহলি, অপরাজিত থাকেন ১৩৩ রানে। যা তাকে উপাধি এনে দেয় ‘চেস মাস্টার’ এর।

২০১৩ সালে ভারতের হয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেন। ফাইনালে তার ব্যাটে আসে সর্বোচ্চ ৪৩ রান।

২০১৪ সালে প্রায় একাই টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতিয়ে ফেলেছিলেন ভারতকে। পুরো টুর্নামেন্টে রান করেন ৩১৮। গড় ১০৬! ফাইনালে ভারতের ১৩০ রানের ৭৭ রানই আসে তার ব্যাট হতে! তবে ভাগ্য কাটা পরে ফাইনালে হেরে যায় তার দল। দল হেরে গেলেও টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটার হন বিরাট কোহলি।

২০১৬ সালে টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপেও একই অবস্থা। দলের টপ অর্ডারের ৫ জনের মধ্যে তিনি একাই রান তোলেন অর্ধেক। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস মোহালিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৮২ রান। তার সেই ইনিংসে দল যায় সেমি ফাইনালে।

সেমিতেও একাই দল কে টেনে নেন। রান করেন ৮৯! তবে এবারও ভাগ্য কাঁটা পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজে। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলার জন্য এবারও হন টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটার।

একবার সাঙ্গাকারা কোহলি কে নিয়ে বলে ছিলন যে, বিরাটের অবসরের পর ক্রিকেটের বেশিরভাগ রেকর্ডই তার নামে থাকবে। সম্ভবত তিনি ভুল বলেন নি! অভিষেকের পর যেভাবে সবই নিজের করে নিচ্ছেন, তাতে এই কথাটি সত্য হতে শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

চলুন, কিছু রেকর্ড দেখে নিই-

সর্বোচ্চ রান, সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ অর্ধ শতক, সর্বোচ্চ ম্যাচ সেরা, সর্বোচ্চ সিরিজ সেরা, সর্বোচ্চ ডাবল সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ চার, সব কিছুই বিরাট কোহলির নামে।

চলুন, দেখি তার অনন্য কিছু রেকর্ড-

  • ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০৫ ইনিংসে ১০,০০০ রান, যা সবচেয়ে দ্রুত।
  • প্রথম ক্রিকেটার যিনি ওয়ানডেতে ২টি ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টানা ৩টি করে সেঞ্চুরি করেন। প্রতিপক্ষ হলো শ্রীলংকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
  • একমাত্র ক্রিকেটার যিনি এক দশকে ২০,০০০ রান এর বেশি করেছেন!
  • তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার যে কিনা আইসিসি টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে ২ বার ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছেন।
  • একমাত্র টেস্ট ক্যাপ্টেন যে অধিনায়কত্বের প্রথম ৩ ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছেন।

তবে কোহলির জনপ্রিয়তা ক্রিকেট মাঠে বা ভক্তদের কাছেই আর সীমাবদ্ধ নেই। ক্রিকেট ছেড়েছেন অনেক আগেই বা কখনও খেলেননি এমন অনেকেই, যেমন- স্পেনের অধিনায়ক সার্জিও রামোস, ইংলিশ তারকা ফুটবলার হ্যারি কেইন, জার্মানির তারকা থমাস মুলার এরা প্রত্যেকেই বিরাট কোহলিকে ফলো করেন ইন্সটাগ্রামে।

যদি আপনি মাঝে মাঝে উকি দেন তার প্রোফাইলে তবে দেখতে পাবেন সেখানে তাদের কমেন্টও আছে প্রচুর!

তবে এর চেয়েও বড় চমক যেন অন্য জায়গায়। বছর খানেক আগে এক বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন রোনালদোর সাথে।

জেনে অবাক হবেন যে, ক্রিকেটারদের মধ্যেই শুধু কোহলি শীর্ষে নয়। বরং তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন জনপ্রিয় ফুটবলারদের সঙ্গেও। রোনালদো, মেসি ও নেইমারের পরেই খেলোয়ারদের মধ্যে তার ইন্সটাগ্রামে সর্বোচ্চ ফলোয়ারস।

মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে, সব জায়গায়ই তিনি সেরা। তিনি যে বিরাট কোহলি, ভারতের প্রধানতম রান মেশিন।

Leave a Reply