প্রাকৃতিকভাবে ত্বক উজ্জ্বল ও সুন্দর করার সেরা ৫ টি উপাদানের ফেসপ্যাক

বর্তমানের আধুনিক যুগে এসে নানা ধরনের ক্যামিকেল দিয়ে রাতারাতি সুন্দর হচ্ছেন অনেকে। কেমিক্যাল যে ত্বকের কতোটা ক্ষতি করে সেটা কয়েক দিন ক্রিম দেওয়া বন্ধ করে দিলে ব্যবহারকারী হাড়ে হাড়ে বোঝে। ত্বক পাতলা করে দেওয়া, মুখে ব্রণ ওঠা, ত্বকের ক্যান্সার, জ্বালাপোড়া, ইত্যাদি অনেক সমস্যায় ভুগতে হয় ক্যামিকেল জাতীয় ক্রিম ব্যবহারকারীদের।

ক্রিমে থাকা ভারী ধাতু অনেক সময় রাতারাতি ফর্সা করলেও ২/১ মাস ব্যবহার করার পর এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে। যার ফলে যেমন আর্থিক ক্ষতি হয়, ঠিক একইভাবে ত্বকের সৈন্দর্য্যহানী ও হয় বটে। সেই সাথে তা গোপন করার জন্য লোকসমাগম এড়িয়ে ভুক্তভোগীকে লোক সমাগম এড়িয়ে চলার মত সিদ্ধান্তও নিতে হয়। তো, এতো এতো সমস্যায় না ভুগে, ঘরোয়া উপাদান দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর করার ব্যবস্থা নেয়া কি অধিক ভালো নয়?

সৌন্দর্য পিপাসুদের কথা বিবেচনা করে, জনপ্রিয় ৫টি উপাদানের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার নিম্নে দেওয়া হলো

১. চন্দনের ফেসপ্যাক

চন্দন একটি আয়ুর্বেদিক উপাদান, যা আমাদের ত্বকের যত্ন নেয় এবং সজীবতা ধরে রাখে। চন্দন ত্বকের যে যে উপকার করে –

১। চন্দন কাঠ ত্বকে প্রোটিনের মাত্রা বাড়ায় যা আমাদের এলার্জি থেকে রক্ষা করে।
২। ত্বকের টিস্যুতে সংকোচন সৃষ্টি করে এবং ত্বকের ছিদ্রপথ শক্ত করতে সাহায্য করে।
৩। প্রদাহ, ব্রণ বা যে কোনো ধরনের জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে।
৪। ধুলো-ময়লার ফলে ত্বকে যে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায়, এতে থাকা অ্যান্টি স্যাপটিক গুণ সেগুলো দূর করে।
৫। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে।

চন্দনের উপকারি কিছু ফেসপ্যাক

লাবণ্য বৃদ্ধি করতে চন্দনের ফেসপ্যাক এর ব্যবহার

যুগ যুগ ধরে, সুন্দর ত্বকের জন্য চন্দন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানের ক্যামিকেল এর যুগে প্রাকৃতিক উপাদান চন্দনের ফেসপ্যাক দিয়ে ত্বক ও মুখের লাবণ্য বৃদ্ধি করার কার্যকর পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার। এ জন্য চন্দন গুড়ো, গোলাপজল, ও কাঁচা দুধ পরিমাণ মতো নিয়ে একটি ফেসপ্যাক বানিয়ে নিন। মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর, ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের গ্লো ধরে রাখতে ও বাড়াতে এটি সপ্তাহে ২ বার ব্যবহার করুন।

ব্রণ দূর করতে চন্দনের ব্যবহার

চন্দন গুড়ো, মধু, খাঁটি নারিকেল তেল এবং লেবুর রস পরিমাণ মতো মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে সেটি মুখে প্রয়োগ করুন। ৩০ মিনিট পর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ব্রণ দূর করতে প্যাকটি সপ্তাহে ২ /১ বার ব্যবহার করুন।

কালো ছোপ দূর করতে চন্দনের ব্যবহার

চন্দনের সাথে খাঁটি নারিকেল তেল মেশান। পরিমাণ মতো প্যাকটি মুখে ম্যাসাজ করুন এবং সারা রাত রেখে দিয়ে সকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহার করলে অতি দ্রুত কালো ছোপ দূর হবে।

ত্বক নরম বা কোমল করতে চন্দনের ব্যবহার

চন্দনের তেলের সাথে অ্যালোভেরা জেল পরিমাণ মতো মিশিয়ে আলতো ঘষে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিন এবং সকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

আরও পড়ুন –

২. হলুদের ফেসপ্যাক

রুপচর্চার কথা উঠলে হলুদের নাম সবার আগে চলে আসে। মুখের বিবর্ণভাব, কালো দাগ দূর করতে, ব্রণ, মুখের প্রদাহ ইত্যাদি সমস্যা দূর করতে প্রাচিনকাল থেকেই হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হলুদে থাকা কারকুমিন নামক উপাদান স্বাস্থ্য ও ত্বকের জন্য খুব উপকারী। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতে ও ক্ষত নিরাময় করতে অনেক বেশি সাহায্য করে থাকে।

শুধু হলুদ মুখে মাখলে মুখ হলদেটে হয়ে যায় এবং ততোটা সুফল পাওয়া যায় না। তাই হলুদের সাথে কিছু উপাদান যুক্ত করে ফেইস প্যাক বানাতে হবে।

হলুদ, মধু ও লেবুর রসের ফেসপ্যাক

২ চামচ হলুদ গুড়ো, এক চামচ মধু ও ১ চামচ লেবুর রস মিশিয়ে নিন এবং প্যাকটি মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

হলুদ এবং টক দইয়ের ফেসপ্যাক

২ চামচ ময়দা, ১ চামচ লেবুর রস, ১ চামচ হলুদ গুড়ো, ১ চামচ মধু ও ২ চামচ টকদই মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। প্যাকটি লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর, কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্যাকটি ত্বকের উজ্জলতা বাড়াবে এবং টান টান রাখবে।

হলুদ ও দুধের ফেসপ্যাক

২ চামচ হলুদ গুড়োতে ২ চামচ কাঁচা দুধ মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। এটি ২০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্যাকটি ত্বকের দাগ কমাবে ও উজ্জ্বলতা বাড়াবে।

হলুদ ও বেসনের ফেসপ্যাক

২ চামচ কাঁচা হলুদ বাটা, ১ চামচ বেসন, ১ চামচ দুধ, ১ চামচ মধু ও ১ চামচ অলিভ অয়েল একসাথে মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে নিন। ২০ মিনিট রেখে ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়ে অ্যালোভেরা জেল বা ভালো ময়েশ্চারাইজার লাগান। এই প্যাকটি ব্রণ কমাবে ও লাবণ্য বৃদ্ধি করবে।

৩. শশার ফেসপ্যাক

শশা একটি সহজলভ্য ও পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ সবজি। এটি স্বাস্থ্য ও ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। এতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি। তারুণ্য বজায় রাখতে, সানবার্ন ও ব্রণ দূর করতে শশার ব্যবহার অতুলনীয়।

শশা ও মধুর ফেসপ্যাক

শশা ব্লেন্ডার মেশিনে ব্লেন্ড করে এর রস বের করে নিন। সাথে যোগ করুন মধু ও গোলাপ জল। মিশ্রনটি ত্বকে ২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

শশা ও টক দইয়ের ফেসপ্যাক

কচি শশা ব্লেন্ড করে এর রস নিন। সাথে যোগ করুন ২ চামচ টকদই। মিশ্রণটি ভালো করে মিশিয়ে ত্বকে লাগান। ৩০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি রোদের পোড়াভাব দূর করবে ও ত্বককে কোমল করে তুলবে। এই প্যাকটি অতিরিক্ত তেল অপসারণ করে। তাই ব্রণযুক্ত ত্বকে এটি অনেক ভালো কাজ করে।

শশা ও অ্যালোভেরার ফেসপ্যাক

শশা ব্লেন্ড করে এর সাথে যোগ করুন সতেজ অ্যালোভেরা জেল। এই উপকরণ ভালো করে মিশিয়ে ২০-২৫ মিনিটের মতো রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন এবং ময়েশ্চারাইজার লাগান। শশা ও অ্যালোভেরা ত্বককে কোমল ও নরম করে তোলে। ত্বকের লাবণ্য ফিরিয়ে আনে ও বলিরেখা দূর করে।

শশা ও মুলতানি মাটির ফেসপ্যাক

২ চামচ শশার রস, ১ চামচ মুলতানি মাটি, ১ চামচ গোলাপ জল একসাথে মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে আধঘন্টার মতো লাগিয়ে রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগান। প্যাকটি উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতে অনেক বেশি সহায়ক।

শশা ও দুধের ফেসপ্যাক

শশার পেস্ট, ১ চামচ কাঁচা দুধ ও আধ চামচের কম অর্ধেক পরিমাণ হলুদ একসাথে মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে লাগান এবং ২০ মিনিট পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ত্বক যখন শুষ্ক ও অনাদ্র হয়ে যায় তখন এই প্যাকটি অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন –

৪. ডিমের ফেসপ্যাক

ডিমে রয়েছে প্রোটিন। যা ত্বকের কালচে ভাব খুব সহজেই দূর করে এবং ত্বকে এনে দেয় মৃসনতা ও উজ্জ্বলতা। পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ ডিম অনেকভাবে ত্বকে ব্যবহার করা যায়। নিচে ডিম ব্যবহার করে তৈরি করা কিছু জনপ্রিয় ফেইস প্যাক এর প্রস্তুত পদ্ধতি ও ব্যবহার উল্লেখ করা হলো।

ব্রণের জন্য ডিমের ফেসপ্যাকের ব্যবহার

ডিমের সাদা অংশ এবং মুলতানি মাটি ঘন করে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি মুখে ২০-২৫ মিনিট রাখুন এবং পরে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। যাদের তৈলাক্ত ত্বক, তাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি উপকারী প্যাকটি। এই প্যাকটি সপ্তাহে ২ বার লাগাতে হবে।

এছাড়াও ব্রণের জন্য ডিমের কুসমের ফেইস প্যাকটি ব্যবহার করেও উপকৃত হতে পারেন। এর জন্য ডিমের কুসম, আর্মন্ড অয়েল ও মধু পরিমাণ মতো মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে কুসুম গরম পানি দিয়ে। এর পরপরই লাগিয়ে নিতে হবে ময়েশ্চারাইজার।

উজ্জ্বল ত্বকের জন্য ডিমের ফেসপ্যাকের ব্যবহার

ডিমের সাদা অংশ, বেসন, লেবুর রস, গোলাপজল কয়েক ফোঁটা, আধ চামচ চিনি পরিমান মতো মিশিয়ে একটি হালকা ঘন পেস্ট বানিয়ে নিন। ২০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি অতি দ্রুত ত্বকে গ্লো এনে দিবে এবং ধীরে ধীরে ত্বককে উজ্জ্বল করবে। সপ্তাহে ২-৩ বার টানা ১ মাস ব্যবহার করলেই আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে।

তারুণ্য ফিরে পেতে বা ত্বকের কুচকানো ভাব দূর করতে ডিমের ফেসপ্যাকের ব্যবহার

এর জন্য ডিমের সাদা অংশ, ময়দা, মসুর ডাল বাটা ও মধু একত্রে পরিমাণ মতো মিশিয়ে একটি দুর্দান্ত প্যাক বানিয়ে নিন। প্যাকটি ২৫-৩০ মিনিট পর্যন্ত রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এর পরপরই লাগিয়ে নিন ময়েশ্চারাইজার।

প্যাকটি সপ্তাহে ১ বার ব্যবহারই যথেষ্ট। এটি মুখে ভাজ পরতে দেবে না। মুখ থাকবে ঝকঝকে ও টান টান। ব্যবহারের পর এর কার্যকারিতা আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না।

৫. টমেটোর ফেসপ্যাক

টমেটো একটি জনপ্রিয় সবজি। খাবারের তালিকায় যেমন এর ব্যবহার সাফল্যমণ্ডিত। ত্বকের যত্নেও কিন্তু এর অবদান কোনো অংশে কম নয়। টমেটো ত্বকের রঙ পরিবর্তন করতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এছাড়াও এতে রয়েছে অধিক মাত্রায় পুষ্টি উপাদান। চলুন জেনে নেওয়া যাক টমেটোর কিছু জাদুকরী ফেইস প্যাক তৈরি করার উপায় ও ব্যবহার বিধি।

উজ্জ্বল ঝকঝকে ত্বক পেতে টমোটোর ফেসপ্যাকের ব্যবহার

টমেটোর রস, চন্দন গুড়ো, লেবুর রস, ও আধ চামচ চিনি একত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে প্যাকটি ত্বকে লাগিয়ে আধঘন্টা অপেক্ষা করুন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সপ্তাহে ২ বার ব্যবহার করুন।

এছাড়াও আরেকটি দুর্দান্ত প্যাক আছে উজ্জ্বলতা বাড়ানোর। এর জন্য দরকার হবে- টমেটোর রস, মুলতানি মাটি, লেবুর রস, গোলাপজল, মধু, ও কাঁচা দুধ। উপাদানগুলো পরিমাণ মতো মিশিয়ে প্যাকটি আধঘন্টা লাগিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

সপ্তাহে ২ বার ব্যবহারে ২/১ মাসের মধ্যেই আশানুরূপ ফল পাবেন। প্যাকটিতে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি উপাদান ত্বকে পুষ্টি যোগায়, ময়লা দূর করে ও রাতারাতি ত্বকের লাবণ্য বৃদ্ধি করে। কাজেই উজ্জ্বল ঝকঝকে ত্বক পেতে এই ফেইস প্যাকটির বিকল্প নেই।

ত্বকের শুষ্কতা দূর করার জন্য টমেটোর ফেসপ্যাকের ব্যবহার

টমেটোর রস, অলিভ অয়েল ও মধু পরিমাণ মতো মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। প্যাকটি ২০ মিনিটের মতো রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্যাকটি ব্যবহারের ফলে ত্বক ময়েশ্চারাইজড হবে ও শুষ্কতা দূর করবে। শুষ্কভাব কাটাতে সপ্তাহে ২/১ বার ব্যবহার করা যেতেই পারে।

অনেকেরই অভিযোগ থাকে এগুলো কাজ করে না। আসলে এগুলো কাজ করে। এবং, খুব ভালোভাবেই কাজ করে। তবে সেটা নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করলে। ২/১ দিন ব্যবহার করে রেখে দিলে কোনো কিছুই কাজ করবে না। এর জন্য অবশ্যই পরিমাণ মতো উপাদান ২/১ মাস নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

Leave a Comment