ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করার ৪টি সেরা মার্কেটপ্লেস

আপওয়ার্ক, ফাইভার, ফ্রিল্যান্সার, পিপল-পার-আওয়ার – ফ্রিল্যান্সিং জগতে কাজ করছেন বা করতে ইচ্ছুক এমন প্রায় প্রতিটি লোকই ঘুরে ফিরে অনেকবার শুনেছেন। এগুলো ফ্রিল্যান্সিং সাইট বা মার্কেটপ্লেস। সাইটগুলোতে কিছু লোক কাজের বিজ্ঞাপন দেন বা জব পোস্ট করেন। এগুলি ট্রেডিশনাল অর্থে চাকুরী নয়। স্বল্পমেয়াদী এককালীন কাজ। ইংরেজিতে গিগ বলা হয়।

আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন যে- অধিকাংশ অনলাইন বিশেষজ্ঞের মতে, ভবিষ্যত প্রজন্ম অনলাইনে আয় করার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য শতাংশ বেছে নেবেন গিগ নির্ভর অর্থনীতি। যারা অনলাইনে টাকা ইনকাম করতে চান, তারা এই গিগ নামক যাদুর কাঠির স্পর্শ পেতে দিন-রাত, নাওয়া-খাওয়া ভুলে অন্ধের মত কাজ করে যাচ্ছেন। সরল ভাষায়, এটাই ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করার ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারদের মূল আকর্ষণের বিষয় হয়ে দাড়িঁয়েছে।

এই চারটি সাইটের নাম অনলাইন কাজের সাথে জড়িত মানুষের মুখে মুখে হরহামেশাই শুনতে পাবেন। কারণ, মানুষ এসব জায়গা থেকে আসলেই টাকা উপার্জন করছেন। আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজে একটু খুঁজলেই প্রচুর সংখ্যক আপওয়ার্ক, ফাইভার, ফ্রিল্যান্সার, পিপল-পার-আওয়ার থেকে আয় করা লোকজন পাওয়া যায়।

তারপরও একটি বড় অংশের কাছেই এখনও অজানা এসব সাইট ঠিক কিভাবে কাজ করে।

এই সাইটগুলো মূলতঃ দুই ধরণের মানুষের জন্য ডিজাইন করা।

  • যারা অনলাইনে তাদের কাজ বিক্রী করতে চান। এবং
  • বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (এবং ব্যাক্তি) যারা অনলাইনে তাদের প্রকল্পের কাজগুলো আউটসোর্স করতে চান।

এই চারটি সাইটের সংক্ষিপ্ত, তবে অপর্যাপ্ত নয়, এমন বিবরণ এখানে দেয়ার চেষ্টা করা হল।

আপওয়ার্ক (upwork.com)

আপওয়ার্ক আগে দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। তাদের একটি ইল্যান্স, অপরটি ওডেস্ক। পরবর্তীতে তারা একীভূত হয়ে আপওয়ার্ক (UpWork) নামে নতুন করে পথচলা শুরু করে। বর্তমানে এটা সবচেয়ে বড় ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস। এই ধরণের সাইটগুলোর মাঝে সবচেয়ে সুপরিচিতও। আপওয়ার্ক বিষয়ে জানলে, আপনি একটি ধারণা পাবেন যে কিভাবে কাজে করে এই ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্মগুলো।

কিভাবে যোগ দিবেন : আপনি ফ্রিল্যান্সার হতে চান? আপওয়ার্কে যে ধরণের কাজ করে মানুষ ইনকাম করে বলে শুনেছেন, তেমন কিছু দক্ষতা আপনার আছেও। এক্ষেত্রে প্রথমে আপনাকে সাইন-আপ করতে হবে। সাইন-আপ করার জন্য ইমেল এড্রেস আর ফোন নাম্বার থাকা প্রয়োজন। এই দুটো দিয়ে আপওয়ার্ক আপনাকে ভেরিফাই করবে।

প্রোফাইল তৈরী করুন : এই ধাপগুলো পার হওয়ার পর আপনার একটি একাউন্ট তৈরী হবে www.upwork.com (আপওয়ার্ক ডট কম) এ। আপনি তারপর একটি প্রোফাইল বানাবেন। প্রোফাইলে আপনার ছবি দিবেন। ছবিটা প্রফেশানাল মানের দেয়াই ভালো। আপনাকে দেখে যেন ভরসাযোগ্য লোক বলে মনে হয়।

প্রোফাইলে কি কি আপনি করতে সক্ষম সেই সব যোগ্যতার বিষয়ে লিখবেন। কোন কিছুতে বিশেষ রকমের ভাল হলে সেটাও জানাবেন। এসব বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রোফাইল দেখে-পড়েই ক্লায়েন্টরা আপনার বিষয়ে ধারণা নিবে। সেই অনুযায়ী তারা আপনাকে গিগ দিবেন বা এড়িয়ে যাবেন।

পোর্টফোলিও : আপনি যেসব কাজ করেছেন সেগুলির ছবি দিয়ে, নমুনা দিয়ে, পোর্টফোলিও তৈরী করুন। পোর্টফোলিওতে দায়সারা গোছের কিছু রাখার দরকার নেই। ধরুন, আপনি অনুবাদ করে টাকা আয় করতে চান। সেক্ষেত্রে আগে আপনার অনূদিত কোন বই ছাপা হয়ে থাকলে সেগুলোর ছবি দিয়ে পোর্টফোলিও করতে পারেন। বা আপনার পেশাগত দক্ষতার কোন সার্টিফিকেট থাকলে সেগুলোর ছবি দিন।

টেস্ট দিন: আপনার দক্ষতাকে প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় বরাবরই পরীক্ষা বা টেস্ট। আপওয়ার্কে এরকম টেস্ট রয়েছে। যেমন ধরুন, আপওয়ার্কে লেখালেখি, ভাষান্তর এরকম অনেক কাজ থাকে। সেক্ষেত্রে আপনি বানান, ব্যাকরণ ইত্যাদি বিষয়ক পরীক্ষাগুলো দিতে পারেন। আবার ‌আপনি নিজের প্রোগ্রামিংয়ের ক্ষমতা প্রমাণ করার জন্য প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এবং বিভিন্ন টুলস বিষয়েও পরীক্ষা দিতে পারেন। সাধারণতঃ যে ধরণের বিষয়গুলো নিয়ে টেস্ট থাকে :

  • ইংরেজি বানান বিষয়ক টেস্ট (যুক্তরাষ্ট্রীয় বা যুক্তরাজ্যীয় সংস্করণ)
  • ইমেইল লেখার পদ্ধতি বিষয়ক টেস্ট।
  • পিএইচপি (PHP) টেস্ট – পিএইচপি একটি ওয়েব ডেভেলপিং ল্যাঙ্গুয়েজ।
  • কল সেন্টার বিষয়ক দক্ষতা নিয়ে টেস্ট।
  • জাভাস্ক্রিপ্ট বিষয়ক টেস্ট।
  • এনড্রয়েড প্রোগ্রামিং বিষয়ক টেস্ট।
  • ওয়ার্ডপ্রেসে দক্ষতা নির্ণয়ের টেস্ট।

সাধারণতঃ এই বিষয়গুলোই ঘুরে ফিরে আসে।

টেস্টগুলো দিতে বেশ একটু সময় লাগে। সক্রিয় একটি ইন্টারনেট কানেকশান থাকতে হবে। হাতে একটু সময় নিয়ে বসবেন। টেস্টের স্কোর আপনার প্রোফাইলে দেখাবে। এটি ক্লায়েন্ট আকর্ষণে খুবই কার্যকরী। সুতরাং কষ্ট করে হলেও এই টেস্টে ভাল করতে পারলে যথেষ্ট লাভ। আপনি যেসব কাজ করেছেন ইতিমধ্যে সেগুলোর স্ক্রীণশট এবং ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

ঘন্টা প্রতি আপনার সম্মানী নির্ধারণ করুন : আপনাকে সম্মানীর বিষয়টি ঠিক করতে হবে। আপনি প্রতি ঘন্টায় কত টাকা চান সেটি জানান। প্রোফাইলে এরকম দিতে হয়। তবে ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ শুরু হলে এসব নিয়ে দ্বীতিয় আলাপের সুযোগ তো থাকেই।

কাজ করার প্রস্তাব দিন : একটি সমৃদ্ধ প্রোফাইল তৈরী করা হয়ে গেল। এবার আপনি যদি অপেক্ষা করেন যে ক্লায়েন্টরা আপনাকে এসে নিজেরাই কাজ দিতে চাইবেন, তাহলে আশাহত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। আপওয়ার্ক যথেষ্ট প্রতিযোগিতাপ্রবণ জায়গা। আপনার নিজেকেই এগিয়ে আসতে হবে।

আপনি আপনার প্রাসঙ্গিক কাজের সার্চ করুন। অনুসন্ধান অনুযায়ী গিগের তালিকা পাবেন। তারপর “সাবমিট আ প্রপোজাল” বাটনের মাধ্যমে কাজ করার প্রস্তাব দিন।

আরও পড়ুন –

আপওয়ার্কে একাউন্ট করার খরচ

আপওয়ার্কের একদম প্রাথমিক বা বেসিক একাউন্টটি ফ্রি। তবে আপওয়ার্ক প্লাস, যেটাকে ফ্রিল্যান্সার প্লাস বলে, ওটাতে আপগ্রেড করলে আপনাকে মাসে ১৪.৯৯ ডলার গুনতে হবে। আপগ্রেড করলে সাধারণ একাউন্টের তুলনায় বেশী কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়। কিছুদিন আগেই পরিমাণটি ছিল দশ ডলার। ফ্রিল্যান্সিং কাজের প্রতিযোগিতা কিভাবে বাড়ছে এটা তার আরেকটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনাযোগ্য।

আপওয়ার্ক প্লাসে সুবিধা হচ্ছে, এই আপগ্রেডটি আপনাকে বেসিক একাউন্টের তুলনায় অনেক বেশী “কানেক্ট” এনে দেয়। অর্থাৎ, আপনার সুনির্দিষ্ট দক্ষতা ভিত্তিক কাজ দিতে পারে এমন সম্ভাব্য নিয়োগদাতাদের সাথে আপনাকে সংযুক্ত করে।

কমিশন : আপনার উপার্জন থেকে নিজেদের একটি অংশ বা কমিশন কেটে রাখবে আপওয়ার্ক। এখানে প্রতিটি ক্লায়েন্টের আলাদা হিসেব। ধরুন একজন ক্লায়েন্টে আপনাকে কাজ দিল। এই নতুন ক্লায়েন্টের সাথে আপনার প্রথম পাঁচশ ডলার ইনকাম পর্যন্ত আপওয়ার্ক কমিশান কাটবে বিশ পার্সেন্ট। পাঁচশ ডলার এক সেন্ট থেকে দশ হাজার ডলার পর্যন্ত কমিশান কাটা হবে দশ পার্সেন্ট। এরপর দশ হাজার ডলার এক সেন্ট থেকে পরবর্তী সমস্ত ইনকামে কাটা হবে পাঁচ পার্সেন্ট কমিশান।

ওয়ার্কডায়রী এবং মাইলস্টোন (ট্র্যাকিং টুলস)

আপওয়ার্ক একটি চমৎকার সাইট অনলাইন ইনকামের জন্য। বহু মানুষ সাইটটি ব্যবহার করে সফল হয়েছেন। কাজ পাওয়া এবং কাজ সম্পন্ন করার খুব কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে আপওয়ার্কে। আপওয়ার্কে “ওয়ার্ক ডায়রী” বলে একটি জিনিস আছে। এটি আপনি কী-বোর্ডে কোন কী চাপছেন, সেটি রেকর্ড করে। ঘন্টায় ছয় বারের মত আপনার কাজের স্ক্রীণশট নেয়।

আপনি যদি ফিক্সড প্রাইসের (ঘন্টা-প্রতি নয়) কাজ নেন, সেক্ষেত্রে ওয়ার্ক-ডায়রী অগ্রাহ্য করতে পারেন। এই ধরণের কাজগুলোর জন্য রয়েছে “মাইলস্টোন”। মাইলস্টোন একটি কাজকে অনেক গুলো পর্যায় এবং পর্যায় ভিত্তিক পে-মেন্টে ভাগ করতে পারে। আপনার, ক্লায়েন্ট বা নিয়োগকারীর সাথে কথা বলে আপনি এটি সাজিয়ে নিতে পারেন।

এগুলি আপনার কাজের ট্র্যাকিং টুল। ক্লায়েন্ট বা নিয়োগকারী জানছেন তাদের কাজ কিরকম আগাচ্ছে। এগুলি আপনি ব্যবহার করতে না চাইলে একটু সমস্যা। কারণ আপনার প্রতিযোগী অন্য ফ্রিল্যান্সাররা ঠিকই ব্যবহার করবেন।

ট্র্যাকিংয়ের এই মাধ্যম না থাকলে তো কোন কথাই ছিল না। কিন্তু যেহেতু একটি পদ্ধতি সাইটে আছে, আপনি যদি ব্যবহার না করেন তাহলে একটু অদ্ভুত দেখায়। এখানে এটাও বেশ বোঝা যাচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে ঘন্টা প্রতি টাকা দিতেই ক্লায়েন্টগণ বেশী আগ্রহ। এজন্যই তারা ঘন্টা হিসেবে কাজের অগ্রগতি ট্র্যাক করতে চান। এটি অবশ্য ভালো। ঘন্টা প্রতি কাজই বেশী সুবিধাজনক ও লাভের।

তো, আপওয়ার্কে কাজ করার আগে এটুকু জানলেই আপনার চলবে। বিভিন্ন অনলাইন ফোরাম, এবং ফ্রিল্যান্সারদের আলোচনা থেকে যতটুকু বোঝা যায়- আপওয়ার্ক মূলতঃ ক্লায়েন্টদের জন্যই ভাল জায়গা। ফ্রিল্যান্সার’রা একটু কোনঠাসা হয়ে থাকবেন এখানে।

আপনার কম্পিউটারে ট্র্যাকার বসিয়ে ঘন্টা হিসেবে আপনার ওপর নজরদারি করছেন নিয়োগকর্তা – এই বিষয়টি অনেকেরই অস্বস্তির কারণ হয়। তার ওপর আবার আপনার কাছ থেকেই কমিশন কেটে নিচ্ছে। এসব কারণে ফ্রিল্যান্সিং কাজের যে মূল আকর্ষণ – স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারীতা – সেটি একটু কম পাওয়া যায় আপওয়ার্কে।

তথাপি, বিশ্বাসযোগ্য বা অথেনটিক ফ্রিল্যান্সিং সাইট হিসেবে আপওয়ার্ক অন্যতম। ধৈর্য্য এবং পরিশ্রমের সাথে কাজ করলে আপনি সাফল্য পাবেনই।

পিপল-পার-আওয়ার (www.peopleperhour.com)

পিপল-পার-আওয়ার সাইটটি শুরু হয় ২০০৭ সালে। লন্ডন থেকে এর কার্যক্রমের সূচনা। প্রতিষ্ঠাতা দু’জনের নাম জেনে রাখতে পারেন – জেনিওস থ্রেসিভুলু এবং সাইমোস কিটিরিস। সাধারণ উদ্যোক্তা এবং স্টার্ট-আপরাই এই সাইটের ক্লায়েন্ট। তারা ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ দিয়ে আউটসোর্সিঙের মাধ্যমে কোম্পানীকে গড়ে তুলতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ, যারা গতানুগতিক ধারায় অফিস তৈরী করতে চান না বা এজেন্সী দিয়ে কাজ করাতে চান না, তেমন ক্লায়েন্টরাই আসেন এই সাইটে।

এখানে কাজের অনেক রকমফের। এক ঘন্টার ছোট কাজও আছে। এগুলোকে বলে ‘অফার’। আবার এমন কাজও আছে, যেটাতে এই সাইটের ফ্রিল্যান্সারদের নিয়েই গোটা একটা কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা হয়। সেক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সার “ট্যালেন্ট ক্লাউড” এর অংশ হিসেবে কাজ করবে। আরও হাজার হাজার, বিভিন্ন দক্ষতা সম্পন্ন ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে গড়ে ওঠে ট্যালেন্ট ক্লাউড।

প্লাটফর্ম হিসেবে পিপল-পার-আওয়ার একটু কম পরিচিত ওয়েবসাইট। কিন্তু অনেক দিক থেকে বিবেচনা করলে পিপল-পার-আওয়ারের পরিবেশ বেশ চমৎকার।

বিশেষ করে আমরা যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাসিন্দা তাদের কাছে পিপল-পার-আওয়ারের একটি বাড়তি আবেদন আছে। অনেকেই পিপল-পার-আওয়ারে খুবই উচ্চ পারিশ্রমিকের কাজ পেয়েছেন। দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্কও গড়ে ওঠে ক্লায়েন্টদের সাথে।

প্রোফাইল তৈরী নিয়ে আলাদা করে আর বললাম না। কারণ, সকল ফ্রিল্যান্সিং সাইটেই মূলতঃ একই ধরণের কতগুলো বিষয়ের ভিত্তিতেই নিজের প্রোফাইল সাজাতে হয়। আপনার নাম, ছবি, দক্ষতা বা কি ধরণের কাজ করতে চান, আগের কাজের বর্ণণা বা পোর্টফোলিও, দক্ষতা প্রমাণের টেস্ট -এসবই ঘুরে ফিরে আসবে।

তার চেয়ে খরচের কথায় আসি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের দুই তারিখ, পিপল-পার-আওয়ারের সার্ভিস ফী গুলো শেষ আপডেট করা হয়। সে অনুযায়ী প্রতি ক্লায়েন্টের সাথে প্রথম ৩৫০ ডলারের কাজের জন্য আপনি পিপল-পার-আওয়ারকে কমিশন দেবেন ২০ পার্সেন্ট। এর মাঝে ভ্যাট ধরা হয়নি। ৩৫০ এর পর থেকে ৭০০০ ডলার পর্যন্ত আয় অবধি, আপনি কমিশন দেবেন ৭.৫ পার্সেন্ট। এবং ৭০০০ ডলারের পর থেকে ঐ ক্লায়েন্টের কাছ থেকে সব ধরণের ইনকামের জন্য কমিশন দেবেন ৩.৫ পার্সেন্ট করে। অর্থাৎ, আপওয়ার্কের থেকে আপনার কম টাকা দিতে হচ্ছে।

আপওয়ার্কের তুলনায় পিপল-পার-আওয়ারের আরেকটি সুবিধা আছে। এখানে কোন ট্র্যাকার নেই। আপনার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কিছু কিছু ক্লায়েন্ট এই বিষয়টি পছন্দ করেন না। কিন্তু আমরা যারা ফ্রিল্যান্সিং করে বাঁচতে চাই, তাদের জন্য মজাই তো।

ফ্রিল্যান্সার (freelancer.com)

ফ্রিল্যান্সার সাইটটিও অনলাইন ভিত্তিক কাজের একটি সমৃদ্ধ বাজার। এখানে কাজ করতে চান এবং কাজ দিচ্ছেন এমন মানুষরা পরস্পরকে খুঁজে নেন। সাইটে নিয়োগকর্তারা কাজের পোস্ট দেন। সাইটের সদস্যরা সেই কাজের জন্য “বিড“ করতে পারেন। একটি প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ পেতে হয়।

সাইটে সদস্যরা নানান ধরণের “কন্টেস্ট” বা প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এসব প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে টাকা দেয়া হয়ে থাকে।

ফ্রিল্যান্সার এবং নিয়োগকর্তাগণ সাইটে তাদের প্রো‌ফাইলকে সময়ের সাথে সাথে সমৃদ্ধ করে তোলেন। কি কি কাজ তারা সম্পন্ন করলেন, বিড করে জিতলেন, তাদের অনন্যতাগুলো কিরকম – সেসব প্রতিনিয়তই যুক্ত হতে থাকে ফ্রিল্যান্সার সাইটের সদস্যদের প্রোফাইলে। সাইটের অন্য যেসব সদস্য তাদের সাথে কাজ করেছেন, তারাও রিভিউ দেন। এই রিভিউগুলোও প্রোফাইলে যুক্ত করা হয়।

সাইটের মেম্বাররা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘বিড’ পেয়ে থাকেন। এই নির্দিষ্ট সংখ্যক বিডই আপনাকে সাইটে ব্যাবহার করতে হবে। তবে সময়ের সাথে এই বিডের সংখ্যা নবায়ন করবে ফ্রিল্যান্সার সাইট। সাইটে আপনি নানান ধরণের একাউন্ট তৈরী করতে পারেন। সম্পূর্ণ ফ্রি একাউন্ট যেমন রয়েছে। তেমনি সাবক্রিপশান ভিত্তিক পেশাদার একাউন্টও তৈরী করা যায়।

ফ্রিল্যান্সার সাইটে, ঘণ্টা ভিত্তিক কাজের জন্য, ফ্রি-ল্যান্সারদের কাছ থেকে ১০ পার্সেট ফি কেটে নেয়া হয়। অন্যদিকে ফিক্সড প্রাইসের কাজগুলোর জন্য নূন্যতম ৫ ডলার দিতে হবে আপনার সাইটকে।

ফ্রিল্যান্সারে সবচেয়ে বেশী যে কাজগুলোর আবেদন করা হয় , সেগুলি তথ্য-প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার ভিত্তিক কাজ। প্রায় ৩৪ শতাংশ কাজই এমন। ডিজাইন, মিডিয়া এবং আর্কিটেকচার ভিত্তিক কাজ ৩১ পার্সেন্ট। লেখালেখি এবং কন্টেন্ট নির্মাণ ভিওিক কাজের পরিমাণ ১৩ পার্সেন্ট।

ফ্রিল্যান্সারও একটি ডেস্কটপ ভিত্তিক ট্র্যাকিঙ এ্যাপ চালু রেখেছে। ফ্রি-ল্যান্সার এবং নিয়োগকর্তাদের মাঝে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরীর জন্য এই অ্যাপটি কার্যকরী বলে মনে করে ফ্রিল্যান্সার সাইট। তারা বলেন, এই ট্র্যাকিং এ্যাপটি ব্যাবহার করলে সদস্যদের উপার্জন “৩০০ পার্সেন্ট পর্যন্ত বেড়ে যায়” – যদিও এটি বিজ্ঞাপনের ভাষা মাত্র। তবে সুখবর হচ্ছে, এই অ্যাপটি আপওয়ার্কে অ্যাপের মত সাইটের মধ্যেই ইন-বিল্ট করে দেয়া নয়। ফলে আপওয়ার্কের মত অ্যাপের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে না। তারপরও অ্যাপ যেহেতু আছে, সুতরাং ক্লায়েন্ট এটি আপনাকে ব্যবহারের জন্য জোরাজুরি করতে পারেন।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে দেখতে পারেন –

ফাইভার (www.fiverr.com)

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে যাত্রা শুরু করে ফাইভার। মিশা কওফম্যান এবং শাই উনিগার এর প্রতিষ্ঠাতা। ফাইভার প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল ধারণা ছিল এরকম – প্রতিষ্ঠাতারা ফ্রিল্যান্স কাজের এমন একটি দ্বিপক্ষীয় প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে চাচ্ছিলেন যেখানে মানুষ বহু প্রকারের ফ্রিল্যান্স ঘরানার ডিজিটাল সেবা কিনতে এবং বিক্রী করতে পারবেন।

সাইটে যেসব সেবা পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে – লেখালেখির কাজ, অনুবাদ, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা, প্রোগ্রামিং।

ফাইভারের কাজগুলো শুরু হয় পাঁচ ডলার দিয়ে। এই জন্যেই সাইটের নাম ফাইভার। তবে গিগের ধরণ অনুযায়ী একটি কাজের দাম হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

২০১০ সালের ওয়েবসাইট যাত্রা শুরু করল। ২০১২ সাল নাগাদ সেখানে গিগের সংখ্যা দাড়াল ১.৩ মিলিয়নেরও বেশী। ওয়েবসাইটের লেনদেনের সামগ্রিক পরিমাণ ২০১১ সাল থেকে হিসেব করলে ৬০০ পার্সেন্ট হারে বেড়েছে। ফ্রিল্যান্সিং সাইট হিসেবে ফাইভার কতটা মারাত্নক বুঝতেই পারছেন নিশ্চই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রিল্যান্সিং সাইটগুলোর মাঝে ১০০টি জনপ্রিয়তম সাইটের মাঝে ফাইভার অবস্থান করছে। এবং গোটা বিশ্বের হিসেবে শীর্ষ ২০০টি জনপ্রিয়তম ফ্রিল্যান্সিং সাইটের একটি।

আপনার ইনকাম থেকে বিশ পার্সেন্ট কমিশন কেটে নেবে ফাইভার। তার ওপর আবার পেপ্যাল ব্যাবহার করে টাকা তুলতে গেলে আপনাকে পেপ্যাল এর ফিও দিতে হবে। এবং আমাদের বাংলাদেশ থেকে পেপ্যাল ব্যবহার তো একটি সমস্যা বটে। তবে আপনি কাজের দাম নির্ধারণের সময়ই এই বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হবে।

আরও কিছু ফ্রিল্যান্সিং সাইট

যে চারটি ফ্রিল্যান্সিং সাইটের কথা বলা হল, সেগুলো অনলাইন উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রমাণিত। তবে এছাড়াও আরও কিছু ভালো সাইট রয়েছে। তবে এসব সাইট থেকে সবাই ইনকাম করতে পারবেন না। বিশেষ দক্ষতা ও সুযোগ থাকতে হবে।

যারা ডিজাইনের কাজে বিশেষ দক্ষ, তারা https://99designs.com নাইন্টি-নাইন ডিজাইনস থেকে ঘুরে আসতে পারেন। এটি সম্পূর্ণই ডিজাইনারদের সাইট।

কপিরাইটিং-এর ক্ষেত্রে পেশাদার মানুষদের জন্য রয়েছে “কনস্ট্যান্ট কন্টেন্ট” (www.constant-content.com)। যারা ত্রিমাত্রিক মডেল নকশা করতে পারেন তারা যেতে পারেন “ক্রাউড স্প্রিং” (www.crowdspring.com) এবং “ক্যাড ক্রাউড” -এ (www.cadcrowd.com)। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের পড়াশোনার খরচে সাহায্য করার জন্য রয়েছে “কলেজ রিক্রুটার” (www.collegerecruiter.com)। এখানে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের কাজের সুযোগ দেয়া হয়।

যারা কোডিংয়ের কাজ করেন তাদের জন্য দুটি সাইট হচ্ছে : রেন্ট-আ-কোডার (www.rent-a-coder.com) এবং স্ট্যাক ওভারফ্লো (https://stackoverflow.com)।

ভবিষ্যত পৃথিবীর কর্মক্ষেত্র মূলতঃ গিগ নির্ভর হবে। করোনা মহামারির সময়ই আমরা দেখতে পেলাম অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চাইলেই, অফিস ছাড়াই, অনলাইনের মাধ্যমে, তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে। এর ফলে গিগ ভিত্তিক কাজের প্রতি মানুষের প্রবণতা আরও বাড়ল। সুতরাং ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন দক্ষতাগুলোর একটি কি দু’টি শিখে রাখলেও, আপনার গতানুগতিক পেশাটির বাইরে একটি উপার্জনের রাস্তা তৈরী হতে পারে।

সবাই সুস্থ থাকুন, নিজের যত্ন নিন। হ্যাপি ফ্রিল্যান্সিং।

লিখেছেন : সালেহ মুহাম্মাদ

সম্পাদকের বাছাই –

Leave a Comment