বাঙালির বন্ধু – বঙ্গবন্ধু

বাঙালির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতির পিতা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। অনন্য সাধারণ জীবনাদর্শ, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার অবদান তাকে ইতিহাসে চির ভাস্বর করে রেখেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মার্চ অবিভক্ত ভারতবর্ষের বাংলা প্রদেশের গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। উক্ত এই গোপালগঞ্জ জেলাটি আদপে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত।

বঙ্গবন্ধুর পিতা ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়েরা বেগম। শেখ মুজিবুরের পিতা শেখ লুৎফর সরকারি আদালতের এক বিশিষ্ট কর্মচারী রূপে কর্মরত ছিলেন। তাছাড়া পরিচিত মহলে স্পষ্টভাষী হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান ছিলেন শেখ মুজিব।

বাড়িতে পরিচিতরা তাকে ডাকতেন খোকা নামে। চারটি বোন এবং দুইজন ভাই নিয়ে ছিল শেখ মুজিবুরের সংসার। বড় বোনের নাম ফাতেমা বেগম, সেজ বোন হেলেন, মেজ বোন আছিয়া বেগম, এবং তার ছোট বোন ছিলেন লাইলী।

বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ছোট ভাইয়ের নাম ছিল শেখ আবু নাসের। এইভাবে অতি সাধারণ একটি পরিবারে ভাই বোনের মধ্যে গ্রাম্য পরিবেশে বড় হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ছেলেবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলা ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।

বিদ্যালয় শিক্ষা কালীন সময়ে একাধিক খেলায় পুরস্কারও পেয়েছেন শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কেটেছে নিজ গ্রামের গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীকালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সারা জীবনের কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম নির্দেশিত হয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে।

এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী হন। ১৯৪৮ – ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়।

কি সংসদ, কি রাজপথ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে তার কন্ঠ সর্বদা সোচ্চার।

  • ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন।
  • ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান।
  • ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন।
  • ১৯৬৬ সালে ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা’ কর্মসূচি পেশ ও ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলন।
  • ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান।
  • ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয়।
  • ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা অর্জন।

প্রভৃতি ক্ষত্রে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসনের মধ্যে বারো বছর বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্র আক্রমণ ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬শে মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরে তিনি সরাসরি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

তার নামেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি। তাঁর বলিষ্ঠ ও আপোষহীন নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

ঐতিহাসিক আগরতলা মামলাঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তার বিশ্বাস ছিল শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি সেসময়ে গোপনে গঠিত বিপ্লবী পরিষদের সদস্যদের তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছিলেন।

বিপ্লবী পরিষদের পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট রাতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দী করবে। এবং, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবে।

পরিকল্পনাটির ব্যাপারে একবার শেখ মুজিব ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই তা ফাঁশ হয়ে যায়।

এরপর পাকিস্তান সরকার ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা (‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য’) দায়ের করে। শাসকগোষ্ঠী এটিকে ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে আখ্যায়িত করে। এ মামলায় রাজনীতিবিদ, বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক ও প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় এক নম্বর আসামি। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১ ও ১৩১ ধারায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে সশস্ত্র পন্থায় স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়।

বিচারের উদ্দেশ্যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্টিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ১৯৬৮ সালের ১৯শে জুন এ মামলার শুনানি শুরু হয়। শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাংলার আপামর জনসাধারণ। জনরোষের প্রতিক্রিয়া শিকার করে ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় শাসকগোষ্ঠী।

পরদিন ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। লাখো মানুষের জমায়েতে শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ।’

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক যাত্রাঃ শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালি সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমিতে তুলে ধরেন।

বিশ্ব ইতিহাসে বিশেষ করে বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভাষণে স্মরণীয় দলিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ঐতিহাসিক ভাষণের নজির আছে ৭ ই মার্চের ভাষণ তার অন্যতম। পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের নিকট এই ভাষণ অমর হয়ে থাকবে।

৭ই মার্চের ভাষণ থেকে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায়। এ ভাষণের পরেই বাঙালি জাতির সামনে একটি মাত্র গন্তব্য নির্ধারণ করা যায়। তা হল ‘স্বাধীনতা’। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। সেই ডাকেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পরবর্তী করণীয় ও স্বাধীনতা লাভের দিক নির্দেশনা ছিল ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। ‘তিনি আরো বলেন-

“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

এই ভাষণে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রাম, যুদ্ধের কলা-কৌশল ও শত্রুর মোকাবেলার উপায় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুজিবনগর সরকারঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার অম্রকাকন কে নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।

মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০- এর সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ ই এপ্রিল ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠন করা হয়।

এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার। ওইদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ’। মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করা হয়। তার অনপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

এই সরকারের অধীনেই গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী এবং শুরু হয় পাক সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র জনগনের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে বাঙালি ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিনা প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালিরা ছাড় দেয়নি।

দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন রণাঙ্গনে শহীদ হন। আবার অনেকে মারাত্মকভাবে আহত। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঋণ কোনদিন শোধ হবে না। জাতি চিরকাল মুক্তিযোদ্ধাদের সূর্য সন্তান হিসেবে মনে করবে।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ মনে করে যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তারা ছিলেন দেশ প্রেমিক, অসীম সাহসী এবং আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরে বাঙালির অংশগ্রহণ করে। তাই এই যুদ্ধকে ‘গণযুদ্ধ’ বা ‘জনযুদ্ধ’ও বলা যায়।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী, নারী, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ৩০ লক্ষ বাঙালির প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কালবিলম্ব না করে রাতে তিনি পাকিস্তানের পিআইএর একটি বিমানে লন্ডন যাত্রা করে ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁঁছেন। অনেক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজকীয় কমেট বিমানে ৯ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন। পথে তেল নেওয়ার জন্য সাইপ্রাসে যাত্রাবিরতি ঘটেছিল বিমানের।

১০ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য কথাবার্তার পর ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানেই যাত্রা করেছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। ব্রিটিশ কমেট বিমানটি তেজগাঁও বিমানবন্দর স্পর্শ করে বিকেল ৩টায়। সেখান থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালির ভালোবাসা আর স্নেহের পরশ ভেদ করে পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছেন সন্ধ্যা পৌনে ৬টায়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠন প্রক্রিয়াঃ ১৯৭২ সালের ১০ ই জানুয়ারি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে সরকার প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পুনঃর্গঠনের দায়িত্ব নেন।

বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলের উল্লেখযোগ্য অর্জন সমূহ

কৃষি ক্ষেত্রেঃ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খাদ্য শস্য উৎপাদন এমনিতেই বিঘ্নিত হয়েছিল, উপরন্তু পাকিস্তান বাহিনী পরাজয়ের পূর্ব মুহূর্তে সরকারি গুদামে মওজুদ খাদ্যশস্য, শস্যবীজ, সার, কীটনাশক ঔষধ এবং মাঠের গভীর ও অগভীর নলকূপ ধবংস করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে আয় উপার্জন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করে আবাদ করার টাকা-পয়সা কৃষকের হাতে ছিল না। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকার-দালালরা কয়েক লক্ষ হালের বলদ ও গাভী জবেহ করে গােশত খেয়েছে। ফলে হাল চাষের জন্য গবাদি পশুর সংকট দেখা দেয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কৃষি ঋণ প্রদান, বীজ সংগ্রহ করা, গভীর ও অগভীর নলকূপ মেরামত বা পুর্নখনন করা, কয়েক লক্ষ গরু আমদানি করা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষি পুনর্বাসন কাজ ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান আমলে ভূমি উন্নয়ন ও সেচ কার্যক্রমের কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় ১৯৭১ সালে ৭৪% আবাদি জমি ছিল এক ফসলি এবং মাত্র ২৬% জমি ছিল দো-ফসলি ও তিন ফসলি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলসেচের ব্যবস্থাও ছিল সামান্য।

খাদ্য সংকটঃ বঙ্গবন্ধু সরকারের শাসনভার গ্রহণের সময় দেশে খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ লক্ষ টন। সরকার মাত্র ৪ লাখ টন খাদ্য শস্য মজুদ পান। এমনি সংকটময় পরিস্থিতিতেও সরকারকে প্রায় নব্বই হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি, আটককৃত ৫০-৬০ হাজার রাজাকার ও দালাল এবং প্রায় সােয়া-লক্ষ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর জন্য খাদ্য সরবরাহের এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

ধবংসপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি ভবন ও শরণার্থী পুনর্বাসনঃ পাকিস্তানী বাহিনী সারা বাংলাদেশে প্রায় ৪৩ লক্ষ বসতবাড়ি, ৩ হাজার অফিস ভবন, ১৮ হাজার প্রাইমারি স্কুল, ৬ হাজার হাই স্কুল ও মাদ্রাসা, ৯ শত কলেজ ভবন ও ১৯ হাজার গ্রাম্য হাট-বাজার পুড়িয়ে দেয়।

এগুলাে নতুন করে নির্মাণের জন্য প্রয়ােজন ছিল প্রচুর পরিমাণ অর্থের এবং নির্মাণ সামগ্রী যেমন বাঁশ, কাঠ, টিন ইত্যাদি। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ও দেশের অভ্যন্তরে উদ্বাস্তু হওয়া লক্ষ লক্ষ পরিবারকে পুনর্বাসন করার এক কঠিন দায়িত্ব এসে যায় সরকারের সামনে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার সেই কাজও সুষ্ঠুভাবে করতে সক্ষম হয়।

বিপর্যস্ত শিক্ষা কার্যক্রমঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ ছিল। সে সময় পুড়িয়ে দেয়া শিক্ষাভবনগুলাে পুননির্মাণ এবং ধবংসপ্রাপ্ত আসবাবপত্র, বেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি মেরামত বা নতুন করে নির্মাণ করে ক্লাস শুরু করা নতুন সরকারের জন্য ছিল এক বড়াে দায়িত্ব। তাছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশের উপযােগী পাঠ্য বই রচনা ও প্রকাশের এক গুরু দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য শিক্ষক শহীদ হওয়ায় সে পদগুলাে পূরণের প্রয়ােজন হয়। শিক্ষকদের ৯ মাসের বেতন বন্ধ ছিল। তা পরিশােধ করাও ছিল এক গুরু দায়িত্ব।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ১,৬৫,০০০ প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি সরকারিকরণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের চাল-ডাল সহ পূর্ণাঙ্গ রেশন ব্যবস্থা চালু করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই খাতা ও পোশাক প্রদানের ব্যবস্থা করেন।

বিধ্বস্ত যােগাযােগ ব্যবস্থাঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশে ২৭৪টি ছােট বড় সড়ক সেতু ও ৩০০টি রেল সেতু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সে সময় ৪৫ মাইল রেল লাইনের সম্পূর্ণ অংশ এবং ১৩০ মাইল রেল লাইনের আংশিক ক্ষতি সাধিত হয়। ১৫০টি বগি ও বেশ কয়েকটি রেল ইঞ্জিন অকেজো হয়। রেল ইঞ্জিন ও বগি মেরামতের কারখানাগুলাে সম্পূর্ণ ধবংস করা হয়।

সরকারি পরিবহনের শত শত বাস ও ট্রাক ধবংসপ্রাপ্ত হয়। ধবংসপ্রাপ্ত বেসরকারি বাস ও ট্রাকের সংখ্যা বেহিসেবি। সারা দেশে প্রায় ৩০০০ মালবাহী নৌকা ডুবিয়ে দেয়া হয়। দেশের শতকরা ৮৫টি জলযান ধ্বংস হয়। মাল পরিবহনের সরকারি কার্গোগুলােও নিমজ্জিত হয়।

চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরে মাইন পােতার কারণে বন্দর দুটি অকার্যকর হয়েছিল। দেশের বিমান বন্দরসমূহের রানওয়ের ক্ষতি সাধন করা হয়। অভ্যন্তরীণ যোগাযােগের জন্য বেসামরিক যাত্রীবাহী কোন বিমান সরকারের হাতে ছিল না।

বঙ্গবন্ধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ২৫০ টি ব্রিজ-কালভার্ট, বিধ্বস্ত কলকারখানা, রাস্তাঘাট পুনঃ নির্মাণ ও মেরামত করে।

বিধ্বংস টেলিযােগাযােগ ব্যবস্থাঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার সাথে বিভিন্ন জেলা শহরসহ বিদেশের টেলি-যােগাযােগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়। আত্মসমর্পণের পূর্বে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনগুলােতে পাহারারত পাকিস্তান বাহিনী ট্রাঙ্কব্যবস্থা বিনষ্ট করে দেয়। তারা টেলিফোন সংস্থার নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়।

টেলিফোন ব্যবস্থা সচল করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়ােজন ছিল ঢাকা শহরের জন্য কমপক্ষে ৫০০০ টেলিফোন সেট। ৩১টি ট্রাঙ্ক লাইন নতুন করে স্থাপন। এক্সচেঞ্জের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করা। ২০০০ কিমি দীর্ঘ টেলিফোন তার আমদানি করা। কমপক্ষে ১০০০ দক্ষ টেলিফোন কর্মী ইত্যাদি।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাঃ সারা দেশে বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনগুলাে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। অনেকস্থানে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন ও বিদ্যুৎ পােলগুলাে বিনষ্ট হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় গােডাউনগুলােতে বিদ্যুৎ খুঁটি ও তার কিছুই মজুদ ছিল না।

অর্থনৈতিক অবস্থাঃ আত্মসমর্পণের পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যাংকসমূহে গচ্ছিত কাগজের নােটগুলাে পুড়িয়ে দেয় এবং গচ্ছিত সােনা লুট করে। উপরন্তু ব্যাংকের নথিপত্রও তারা বিনষ্ট করে।

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ অংশের ব্যাংকগুলােতে কর্মরত উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ৬০% এবং নিমস্তরের কর্মচারীদের ২০% ছিল অবাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের পর অবাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত হলে ব্যাংকগুলােতে দক্ষ জনবলের অভাব দেখা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্প-কল-কারখানাগুলাে প্রায় বন্ধ ছিল। ফলে অনেক মিল অকেজো হয়ে পড়ে। এগুলাে চালু করার মত স্পেয়ার পার্টস ও কাঁচামাল কোন গুদামেই মজুদ ছিল না। উপরন্তু বিভিন্ন মিলে কর্মরত অবাঙালি শ্রমিকেরা আত্মগােপনে বা রিফুজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়ায় দক্ষ শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। কাঁচামাল আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়ােজন হয়।

বিপর্যস্ত প্রশাসনিক কাঠামাে ও দক্ষ প্রশাসকের অভাবঃ দেশ পুনর্গঠনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়ােজন ছিল দক্ষ প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, ব্যাংকার এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের। ডাক, তার, রেল, মিল-কল-কারখানা, প্রভৃতি সেক্টরে অভিজ্ঞ কর্মীর প্রয়ােজন ছিল। পাকিস্তান আমলে অবাঙালিরা এসব ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করত বিধায় নতুন রাষ্টের দক্ষ কর্মীর অভাব দেখা দেয়।

সংবিধান ও আইনের শূন্যতাঃ নতুন সরকারের হাতে কোন সংবিধান ছিল না। ছিল উপনিবেশিক আইন ব্যবস্থা। স্বল্প সময়ে সংবিধান প্রণয়ন ও যুগােপযােগী আইন প্রণয়নের গুরু দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর সরকারকে পালন করতে হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার মাএ দশ মাসের মধ্যে জাতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান জাতিকে উপহার দেন। শিক্ষা, শিল্প, খাদ্য, অর্থনীতি, প্রভৃতি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বন্ধুত্বের নীতিতে পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করা হয়।

এছাড়াও শোষনহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমান মজুতদার, কালোবাজারি, প্রভৃতি অশুভ শক্তিকে শক্ত হাতে দমন করেন। তার গৃহিত বিভিন্ন কর্মসূচী সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুর্ণগঠনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে এক অপ্রতিরোধ্য গতিধারা সঞ্চার করে সর্বক্ষেত্রে বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করার মহাকর্মযজ্ঞে সর্বোচ্চ সততা ও আন্তরিকতা দিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। দশ মাসের মধ্যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে জাতিকে বিশ্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান উপহার দেন।

সকল মিল-কারখানা, ব্যাংক ইত্যাদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সবার জন্য সমান অধিকারের ভিত্তিতে এক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকল্পে সোনালী স্বপ্নের আবরণে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করেন।

‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ নীতির ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিপূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান দেশের ইতিহাসেই শুধু নয়, বিশ্ব মানবধিকার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা ও জায়গা বরাদ্দ, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন, বিশ্ব ইজতেমার জমি বরাদ্দ, বাংলাদেশের ওআইসি সদস্য পদ লাভ এবং সৌদি আরবে কম খরচে হজযাত্রীদের পবিত্র হজ পালনের উদ্যোগ, মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ এবং বেতার ও টেলিভিশনে আল কোরআনের বাণী প্রচার করাসহ ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার ও প্রসারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশঃ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের এবং ১৯৭৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৪ সালের ২৫ শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় প্রথম ভাষণ প্রদান করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনেরও সদস্য পদ লাভ করে। বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে।

১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডঃ দেশ যখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখনি আসে আরেকটি আঘাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে সেনাবাহিনীর বিপথগামী একটি দল হানা দেয়। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিপরিবারের সবাইকে একে একে হত্যা করে।

রক্ষা পাইনি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলও। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় সেদিন তারা প্রাণে বেঁচে যান। স্বাধীনতার মাত্র সাঁড়ে চার বছরের মাথায় তাকে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডে আরও শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ দেশবরেণ্য সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আবদুলাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু ও বঙ্গবন্ধুর জীবনরক্ষায় এগিয়ে আসা প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজবন্দী হিসেবে কারাগারে থাকার সময় তিনটি বই রচনা করেন। তিনটি বই সুখপাঠ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ। সময়কে খুঁজে পাওয়া যায় তিনটি বইয়ে।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম বই অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৫৪ সালের ঘটনাবলি পর্যন্ত স্থান পেয়েছে এই বইয়ে।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বই কারাগারের রোজনামচা (২০১৭)। এই গ্রন্থের নামকরণ করেছেন শেখ রেহানা। এই বইও বঙ্গবন্ধু কারাগারে বসে রচনা করেন।

তাঁর তৃতীয় বই আমার দেখা নয়াচীন (২০২০)। এটিও কারাগারে রাজবন্দী থাকার সময়ে রচিত। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে চীনের পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সে সময় নয়াচীন দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি রচিত।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা অনন্য ভূমিকা পালনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন জাতীর পিতা। স্বাধীনতার মহানায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি।

ফলে মৃত্যুতে নিঃশেষ নন এ অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধুও তাঁর অসামান্য দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের চিরঞ্জীব উদাহরণের জন্য বিশ্ব-ইতিহাসের অনিবার্য ও অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

তিনি শুধু বাঙালির বঙ্গবন্ধু নয়, বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিক ’বিশ্ববন্ধু’ উপাধিতেও বিশ্বনন্দিত। ১৯৭১ সালে পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবকে ‘জাতির জনক’ ঘোষণা করা হয়।

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ’রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যে মন্তব্যটি উপস্থাপন করেছে, বস্তুতপক্ষে তা অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। তা ছিল এ রকম-

‘মুজিব মৌলিক চিন্তার অধিকারী বলে ভান করেন না। তিনি একজন রাজনীতির কবি, প্রকৌশলী নন। শিল্প-প্রকৌশলের প্রতি উৎসাহের পরিবর্তে শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক বাঙালিদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কাজেই সকল শ্রেণী ও আদর্শের অনুসারীদের একতাবদ্ধ করার জন্য সম্ভবত তাঁর ‘স্টাইল’ সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল।’

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণকে এক অনবদ্য কবিতা এবং বঙ্গবন্ধুকে মহাকবি হিসেবে ভূষিত করার অবারিত যুক্তি রয়েছে। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু বিশ্বপরিমন্ডলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এক অসাধারণ মহাগ্রন্থে। ইতিহাসে তিনি কিংবদন্তি হয়ে রয়েছেন। তার আদর্শের মৃত্যু নেই। সেই আদর্শের অনুসারী হয়ে আমরা সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। কারণ, ভালোবাসার আরেক নাম- শেখ মুজিবুর রহমান।

লিখেছেন- সুরাইয়া ইয়াসমিন
লিংকডইন প্রোফাইলঃ Suraiya (Swarna) Yasmin

Leave a Comment