নিয়মিত বাদাম খাওয়ার ১২টি উপকারিতা

বাদাম খুবই পুষ্টিকর একটি খাবার। আমাদের শরীরের জন্য উপকারী নানা ধরনের প্রয়োজনীয় উপাদান এতে বিদ্যমান রয়েছে। উপাদানগুলো হলো- ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফাইবার, ওমেগা থ্রি, ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন -সি, ভিটামিন- ই, ম্যাগনেসিয়াম, সেলেনিয়াম ইত্যাদি। নিয়মিত বাদাম খেলে দেহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পায় এবং শরীরকে সুস্থ রাখে। আমাদের আজকের আলোচনায় বাদাম খাওয়ার উপকারিতা সমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আমাদের দেশে – পেস্তা, কাজু, চিনা, দেশী ও কাঠবাদাম অনেকটা পরিচিত। তবে এদেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে কাজু বাদাম ও চিনা বাদাম। বাদাম খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি এর উপকারিতাও অনেক। তাই দেরি না করে চলুন জেনে নেওয়া যাক বাদাম খাওয়ার উপকারিতাগুলো।

বাদাম খাওয়ার উপকারিতা

০১। হার্ট ভালো রাখে

হার্টের সমস্যা কম বয়সী অথবা বেশি বয়স্ক সবারই হতে পারে। অগোছালো জীবনযাপন, অনিয়মিত খাওয়া, স্ট্রেস, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, টেনশন, ব্যায়াম না করা ইত্যাদি কারনগুলোর জন্য হার্টের সমস্যা হতে পারে।

মাঝরাতে হঠাৎ বুকে ব্যাথা হওয়া শুরু করলে ধরে নিতে হবে আপনার হার্টের সমস্যা হওয়া শুরু করেছে। তাই স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে প্রতিরোধই উত্তম।

হার্টের সমস্যা থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ হতে পারে নিয়মিত ৫-৭ টা বাদাম খাওয়া। বাদামে রয়েছে পর্যাপ্ত ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন-ই যা হার্টকে সুস্থ্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই হার্টের সমস্যা থেকে বাঁচতে নিয়মিত বাদাম খান, এটি আপনার হার্টকে সুস্থ্য রাখার পাশাপাশি শরীরে শক্তি যোগাবে।

আরও পড়ুন-

০২। ক্লান্তি দূর করে

কর্মব্যস্ত জীবনে অবসাদ, ক্লান্তি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। শরীরে শক্তি যোগাতে বাদামের জুরি নেই। শক্তির অন্যতম একটি উৎস হলো বাদাম। আপনার শরীর যদি অল্প কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে শরীরে এনার্জির প্রয়োজন।

কাজ করার সময় ক্লান্তভাব এসে গেলে তখনই কাজ থেকে বিরতি নিয়ে এক মুঠো কাঠবাদাম খেয়ে নিন. এটি আপনাকে ইনস্ট্যান্ট এনার্জি দিবে।

০৩। ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

খাবার খাওয়ার পর খাবারের কিছু উচ্ছিষ্ট থেকে যায় আমাদের শরীরে। যাকে মুক্ত মৌল বলা হয়। এগুলো শরীরের বিভিন্ন কোষের ক্ষতি সাধন করে থাকে এবং ক্যান্সার কোষ তৈরিতে সহায়তা করে।

বাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন ১০-১২ টির মতো বাদাম খেলে আপনার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।

০৪। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত বাদাম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেহে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘটতি দেখা দিলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে- শরীরে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি দেখা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্লাড প্রেসার মারাত্মক বেড়ে যায়।

প্রায়শই এমন ঘাটতি দেখা দিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাদামে প্রচুর পরিমানে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ইত্যাদি থাকায় এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

০৫। হাড় শক্ত ও মজবুত রাখে

হাড় শক্ত ও মজবুত রাখতে বাদামের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ইত্যাদির ঘাটতির কারণে হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এগুলোর অভাবে হাড় ভঙ্গুর, নরম ও দুর্বল হয়ে পরে।

হাড়ের সমস্যা থেকে বাঁচতে যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস,প্রোটিন ইত্যাদি দরকার। বাদামে এই উপাদানগুলো ভরপুর মাত্রায় আছে। প্রতিদিন ৮-১০ টার মতো বাদাম খেলে হাড় থাকবে শক্ত ও মজবুত।

০৬। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে

ফিট থাকতে কে না চায়? তা যদি হয় সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে তাহলে তো সোনায় সোহাগা! ওজন কমানোর জন্য আমরা নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে থাকি। ফলাফল খুব একটা সন্তোষজনক হয় না। এক্ষেত্রে বাদাম হতে পারে আপনার পরম বন্ধু!

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ১০-১৫ টি বাদাম ভালো করে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে একটি বাটিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাদাম ভেজানো পানিসহ বাদামগুলো খেয়ে নিন। এতে করে আপনার শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে ও আপনার ক্ষুধার পরিমাণ হ্রাস পাবে।

সারাদিন এটা ওটা খেতে ইচ্ছে করবে না। ফলে নিয়মিত বাদাম এভাবে ভিজিয়ে খেলে আপনার ওজন কমতে থাকবে এবং আপনি হয়ে ওঠবেন ফিট, ঠিক যেমনটি আপনি চান।

০৭। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

বাদাম দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘটতি দূর করে। শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ক্লান্তি দূর করে। মেজাজ ভালো রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও শ্বাসকষ্ট দূর করে এবং ডায়বেটিস প্রতিরোধে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে।

এটি আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেমকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে। যার কারণে আমাদের শরীর ছোট, বড়, নানাধরনের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে।

০৮। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে

ডায়বেটিস এমন একটি রোগ যা কখনো ঠিক হয় না। কিন্তু আপনি চাইলে খুব সহজেই ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ডায়বেটিস রোগীদের আদর্শ একটি খাবার হলো বাদাম। তবে সব ধরনের বাদাম না।

রিসার্চ মতে টাইপ টু ডায়বেটিস রোগীরা চিনাবাদাম খেতে পারেন। চিনাবাদামে প্রোটিন ও আঁশ রয়েছে; যা রক্তের সুগারের পরিমান নিয়ন্ত্রণ করে। টাইপ টু ডায়বেটিস রোগীরা প্রতিদিন ২০-২৫ টির মতো কাঁচা চিনা বাদাম খেতে পারেন। এর ফলে আপনার ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

এছাড়াও খেতে পারেন কাঠবাদাম। এটি ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি আপনার গ্লুকোজের মাত্রাও ঠিক রাখবে। নিয়মিত বাদাম খেলে এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে ও এইচডিএল কোলেস্টেরল ভালো থাকে এবং ডায়বেটিসও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

আরও পড়ুন-

০৯। স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করে

স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করতে বাদামের ভুমিকা অনেক। বাদামে রয়েছে কগনিটিভ পাওয়ার। আমাদের চিন্তাশক্তি ও মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কগনিটিভ পাওয়ারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

ছোট, বড়, সব বয়সের মানুষেরই স্মৃতি শক্তি বাড়াতে বাদাম অপরিহার্য ভুমিকা পালন করে। মূলত এই জন্যই পরীক্ষার আগে আমাদের বাবা, মা, আত্মীয়-স্বজনরা বাদাম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

গবেষনায়ও দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বাদাম খায়; তাদের মস্তিষ্কের ধারন ক্ষমতা বাদাম না খাওয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় বহুগুন বেশি।

১০। ত্বকের কোষের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের ফলে টিউমার, ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগও হতে পারে ( বিশেষ করে মহিলাদের)। বাদামে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দূর্বল ও অনিয়ন্ত্রিত কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে ও দূর্বল কোষগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। তাই ক্যান্সার ও টিউমারের ঝুঁকি এড়াতে দৈনিক খাবারের তালিকায় বাদাম রাখুন।

১১। ডিপ্রেশন কমায়

বর্তমান জেনেরেশনের একটি বৃহৎ পরিমাণ প্রতিনিয়ত ডিপ্রেশন বা হতাশায় ভুগছে। ডিপ্রেশনের বশবর্তী হয়ে অনেক সুইসাইড পর্যন্ত করে ফেলে। অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের মতো ডিপ্রেশনও মানুষকে শেষ করে দিতে পারে। কমিয়ে ফেলে কর্মস্পৃহা। ডিপ্রেশড ব্যক্তি হতাশার সাগরে ডুবে থাকে সবসময় এবং নতুন কোনো কাজের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। ফলে তার সাধারণ জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটে।

এর জন্য কাউন্সিলরের পরামর্শ যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন নিয়মিত বাদাম খাওয়া। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বাদাম ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে- বাদামে থাকা টাইটোফন নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা ডিপ্রেশন কমাতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

১২। লাব্যণ্য ধরে রাখে

লাব্যণ্য ধরে রাখতে পেস্তা বাদাম খুবই উপকারী। এতে প্রচুর পরিমানে আছে ভিটামিন – ই, যা সুন্দর ত্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে থাকা ভিটামিন-ই ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে শুষ্কতার হাত থেকে বাঁচায়।

এটি সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকেও ত্বককে রক্ষা করে। নিয়মিত পেস্তা বাদাম খেলে ত্বক প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাবে ও আপনার লাবণ্য বজায় থাকবে।

বাদামের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এর কিছুটা অপকারিতাও আছে যেগুলো সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো।

সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত বাদাম খান তবে, পরিমান মতো খান। বেশি পরিমাণে বাদাম খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে ও এলার্জিজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

কোনোকিছুই অধিক পরিমাণে খাওয়া ভালো না, বাদামের ক্ষেত্রেও তাই। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত পরিমাণ মতো বাদাম খান।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে দেখতে পারেন-