বেলা গেটম্যানের অভিশাপ

আচ্ছা আপনি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন? কিংবা অভিশাপে? মনে করুন কেউ একজন আপনাকে একটা অভিশাপ দিলো। সেটা আপনার জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে! ভেবে দেখুন তো, কেমন লাগবে?

আচ্ছা আপনার ভাবার প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে এমন এক বাস্তব ঘটনার কথা বলব, যেটা আপনাকে আপনার জীবনে পড়া হয়ত শ্রেষ্ঠ রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে।

একজন মানুষের অভিশাপে কিভাবে একটি ক্লাব বিশ্ব মানের থেকে নেমে মাঝারি মানে চলে এলো এবং সেটা এখনও চলছে।

বেনেফিকা হচ্ছে পর্তুগালের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল ক্লাব। তারা এখন পর্যন্ত ৮৪টি শিরোপা জয় করেছে। ২টি চ্যাম্পিয়নস লীগ ও ৩৭টি পর্তুগিজ প্রিমেইরা লীগ রয়েছে তাদের নামের পাশে। পর্তুগিজ ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে প্রথম থেকে ইউরোপে অর্থাৎ ইউরোপিয়ান কাপে সাফল্য না পেলেও তারা সবসময়ই ঘরোয়া লীগ ও কাপে ধারাবাহিক ছিল।

সময় ১৯৫৯: ব্যক্তিগত কিছু ঝামেলার কারনে তৎকালীন সময়ে আরেক পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তোর কোচ বেলা গেটম্যান সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাব ছাড়ার। যেবার সে ক্লাব ছাড়ে, সেবার তার দল পোর্তো লীগ শিরোপা জিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্তই নেন তিনি।

ক্লাব ছেড়ে তাকে বেশিদূর যেতে হয়নি। পোর্তোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বেনেফিকাতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বেলা গেটম্যান। ১৯৫৯-৬০ সিজন থেকেই তিনি কোচিং করানো শুরু করে বেনেফিকাকে।

আগের সিজনে বেনেফিকার সমান ৪১ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে বেলা গেটম্যানের নেতৃত্বে লীগ শিরোপা জিতলেও পরের সিজনে বেলা গেটম্যান ক্লাব ছাড়ার পর তার পুরান ক্লাব পোর্তো লীগে ৪র্থ স্থানে থেকে শেষ করে। অপরদিকে তার নতুন দল বেনেফিকা জিতে নেয় লীগ শিরোপা।

সেবার শুধু লীগ শিরোপা জিতলেও পরের বছর লীগ শিরোপা জয়ের পাশাপাশি তারা জিতে নেয় বহু আরাধ্য চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা; যা তৎকালীন সময়ে ইউরোপিয়ান কাপ নামে পরিচিত ছিল।

১৯৬১-৬২ সিজন: এই সিজনে বেনেফিকা লিগ শিরোপা না পেলেও তারা ঘরে তুলে নেয় তাকা দে পর্তুগাল ও ইউরোপিয়ান কাপ। অর্থাৎ টানা ২য় বারের মত তারা জিতে চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপা।

সিজন শেষে বেলা গেটম্যান তাদের দলের প্রেসিডেন্টকে তার বেতন বাড়ানোর জন্য আবেদন করে। তিনি কারন হিসেবে নিজের সফলতার কথা বলেন। কিন্তু তাদের প্রেসিডেন্ট যেন তার কথাটা হেসেই উড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি তাকে বলেন ‘আমরা শিরোপা জিতেছি আমাদের ভালো একটি দল রয়েছে বলে, এতে তোমার কোন অবদান নেই। তোমার বেতন বাড়ানো হচ্ছে না’।

এরকম এক কথায় যেন মনে প্রচণ্ড রকমের আঘাত পায় বেলা গেটম্যান। তিনি আসার আগে যেই ক্লাব শিরোপা পেতে খাবি খাচ্ছিল, তিনি আসার পর মাত্র ৩ সিজনেই ৫ শিরোপা, সাথে ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপাও এসেছে তার হাত ধরে। আর শেষ পর্যন্ত কিনা তাকেই এভাবে অপমান!

হয়ত সেই অপমানের কষ্ট সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই অভিশাপ দেয় বেনেফিকা ক্লাবকে। তিনি কোচিং পদ ছেড়ে দেয়ার আগে ক্লাব কে অভিশাপ দিয়ে যায়। তিনি বলেন ‘আগামী ১০০ বছর কোন ইউরোপিয়ান কাপ তোমরা জিততে পারবে না’!

কথাটা তখন তারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলো। কেন দিয়েছিলো জানেন? একে তো তারা একের পর এক শিরোপা জিতে চলছে, তার উপর ঠিক পরের সিজনেই তারা উঠে যায় ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে।

১৯৬২-৬৩ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনাল: সেবার তারা ফাইনালে মাঠে নামে এসি মিলানের বিরুদ্ধে। ফাইনালে ওঠার পর বেনেফিকার সমর্থকেরা বেলা গেটম্যান কে নিয়ে মজা করে, ব্যানার বানায়, আতশবাজি ফুটায় তাকে নিয়ে মজা করতে গিয়ে। কারন তারা আবারও ফাইনালে ওঠে, আবারও শিরোপা জিতে হ্যাটট্রিক করার স্বপ্নে বিভোর হয়।

সেদিনের ফাইনালে ম্যাচের ১৮ মিনিটে ইউসেবিওর গোলে এগিয়ে যায় বেনেফিকা। উচ্ছ্বাসে ভেসে যায় দর্শকরা। এ যেন আরেকটা শিরোপার সুবাস। ২য় অর্ধে জোসে আল্টাফিনির জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি এগিয়ে গিয়েও ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় তারা।

হারকে তারা স্বাভাবিক হারের মতই নিয়েছে। এই হার নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। তারা নিজেদের মতই চলছে। কারন পরের বছরই তারা আবার ঘরে তোলে ২টি শিরোপা।

১৯৬৪-৬৫ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনাল: এক বছর বিরতি দিয়ে ১৯৬৫ সালে আবারও ফাইনালে চলে যায় তারা। এবার তাদের প্রতিপক্ষ মিলানের আরেক ক্লাব ইন্টার মিলান। ক্লাব চেঞ্জ হলেও ভাগ্য চেঞ্জ হয়নি তাদের। ঘরের মাঠ সান সিরোতে জাইরের করা একমাত্র গোলে শেষ পর্যন্ত ইন্টার মিলানের কাছে হেরে বসে বেনেফিকা।

৩ বছর পর আবারও ফাইনালে ওঠে ১৯৬৮ সালে। এবার তাদের প্রতিপক্ষ ম্যান ইউ। সময় এগিয়ে চললেও ভাগ্য বদল হয়নি। ববি চার্লটনের জোড়া গোলে ভর করে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ৪-১ গোলের বিশাল জয় পায় ম্যান ইউ।

টানা ৩ ফাইনাল হারের পর ভয়ে পেয়ে বসে ক্লাব কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে। তারা এবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় বেলা গেটম্যানের কাছে ক্ষমা চাইবে এবং তাকে বলবে তার অভিশাপ উঠিয়ে নেয়ার জন্য।

সিদ্ধান্ত অনু্যায়ী তারা বেলা গেটম্যানের কাছে যায় এবং তার কাছে ক্ষমা চায়। তাকে তার এই অভিশাপ উঠিয়ে নিতে বলে কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। সে আবারও স্পষ্ট বলে দেয় ১০০ বছরের আগে তারা কোন ‘ইউরোপিয়ান কাপের’ শিরোপা পাবে না!

বেলা গেটম্যানের মৃত্যু: ২৮ আগস্ট ১৯৮১ সালে ৮৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বিদায় নেয় বেলা গেটম্যান। তার মৃত্যুর পর বেনেফিকা খেলোয়াড়, সমর্থক ও ক্লাব কর্মকর্তারা ভাবতে শুরু করে এবার হয়ত ভাগ্য পরিবর্তন হবে তাদের। তার মৃত্যু এই ‘অভিশাপ’ এ প্রভাব ফেলে সব কিছু আগের মত করে দিবে।

কিন্তু তাতেও যেন ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি বেনেফিকার। তার মৃত্যুর পর ১৯৮৩ সালে প্রথম ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে খেলে বেনেফিকা। সেবারের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আন্ডারলেখট। উক্ত ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে তার প্রিয় শিষ্য ইউসেবিও তার সমাধিস্থলে ফুল দিয়ে আসে। সাথে ক্ষমা চেয়ে আসে যেন তাদের ক্ষমা করে দেয় এবং অভিশাপ উঠিয়ে নেয়। কিন্তু সেই ফাইনালেও আন্ডারলেখটের কাছে ২-১ গোলে হেরে বসে তারা!

৮৮ তে হেরেছে পিএসভি এর কাছে। প্রথমে গোল শুন্য ড্র হয়, শেষে পেনাল্টি শুট আউটে ৬-৫ গোলে হেরে বসে তারা।

১৯৯০ সালে ফাইনালে এসি মিলানের কাছে ১-০ গোলে হেরে বসে তারা। যেটা ছিল তাদের সর্বশেষ কোন ইউরোপিয়ান কাপ বা বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনাল খেলা।

১৯৯২ সালে ইউরোপিয়ান কাপের নাম চেঞ্জ করে রাখা হয় চ্যাম্পিয়নস লীগ এবং নতুন এক টুর্নামেন্ট চালু হয় ইউরোপা লীগ।

২০১৩ ও ২০১৪ সালে পর পর ২ বছর ২ বার ইউরোপা লীগের ফাইনালে ওঠে তারা। ভেবেছিল নতুন টুর্নামেন্ট, যদি ভাগ্যে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এখানেও হেরেছে চেলসি ও সেভিয়ার কাছে।

বেলা গেটম্যান অভিশাপ দিয়ে ক্লাব ছাড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৮টি ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে (৬টি চ্যাম্পিয়নস লীগ ও ২টি ইউরোপা লীগ) খেলেছে তার দল বেনেফিকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এই ৮ ফাইনালে একটিও জয় পায় নি তার দল।

সেই ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর থেকে তার জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বেনেফিকা ভক্তরা নিয়মিত ফুল দেয় এবং তার কাছে ক্ষমা চায় এবং তারা প্রত্যাশা করে যেন তিনি তার এই অভিশাপ তুলে নেয়।

কিন্তু কে জানে, হয়ত ওপারে বসে তিনি হাসছেন আর বলছেন ‘আরেকটু অপেক্ষা করো বাছারা, ১০০ বছর হোক তারপর ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল জিতবে তোমরা’।

Leave a Reply