ব্যালন ডি’অর এর ইতিহাস

বর্তমান ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরষ্কারের নাম বললে প্রথমেই যেসব পুরষ্কারের নাম মাথায় আসবে সেগুলো হচ্ছে- ব্যালন ডি’অর, ফিফা দ্যা বেস্ট ও উয়েফা বেস্ট। তবে এদের মধ্যে সেরা কোনটা তা নির্ধারণে বোধহয় বেশি আলোচনা হবে ফিফা দ্যা বেস্ট ও ব্যালন ডি’অর নিয়ে। কারন দ্যা বেস্ট এর বিজয়ী নির্ধারণ করে ফিফা। তবে, তা স্বত্বেও ব্যালন ডি’অর নিয়েই যে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে!

আপাততঃ সেই যুক্তি তর্ক থাকুক। চলুন আমরা একটু জেনে নেই ব্যালন ডি অর সম্পর্কে।

ইতিহাসঃ ফ্রান্স ভিত্তিক ম্যাগাজিন যার নাম- ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন; মূলত প্রথম ব্যক্তিগত পুরষ্কার দেয় (কোন ইভেন্টের বাইরে) যা ব্যালন ডি অর নামে পরিচিত। ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই পুরষ্কার প্রথমবার জিতে নেয় ইংলিশ ফুটবলার স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস।

পুরষ্কার প্রদাণের নিয়ম

আশ্চর্যজনক তথ্য হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যালন ডি অর শুধু ইউরোপিয়ান ফুটবলারদেরই দেয়া হত। কোন প্রকার নন ইউরোপিয়ান ফুটবলারই ব্যালন ডি অর এর নির্বাচনের ক্ষেত্রে জায়গা পেতেন না। এমনকি যেসব ফুটবলারগন ইউরোপে খেলতো তারাও ব্যালন ডি অর নমিনেশনে জায়গা পেতেন না।

প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যালন ডি অর পুরষ্কার দেয়া হত শুধুমাত্র সাংবাদিকদের ভোটে। দীর্ঘ ২০০৬ সাল পর্যন্ত শুধু সাংবাদিকরাই সিদ্ধান্ত নিতো যে এই পুরষ্কারটি যাচ্ছে কার হাতে। ২০০৭ থেকে সকল জাতীয় দলের কোচ এবং ক্যাপ্টেনও অংশ নিতে পারে এই পুরষ্কারের ভোটে।

শুধু যে ভোটেই পরিবর্তন আসে, তা কিন্তু নয়। পরিবর্তন আসে পুরষ্কার দেয়ার নিয়মেও। ১৯৯৫ সাল থেকে ব্যালন ডি অর শুধু ইউরোপিয়ান ফুটবলাররাই জিততে পারতো না। সাথে যারা নন ইউরোপিয়ান ছিল তবে ইউরোপিয়ান ক্লাবে খেলতো তারাও এই পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত হতে পারত।

১৯৯৫ সালের প্রথম এই পরিবর্তনে সেবারই প্রথম নন ইউরোপিয়ান হিসেবে ব্যালন ডি অর জিতে নেন আফ্রিকার ফুটবলার জর্জ উই। মিলানের হয়ে অসাধারণ পারফর্ম করার কারনে এই পুরষ্কারটি জিতে নেন তিনি। যদিও এটিই ছিল তার ক্যারিয়ারে একমাত্র ব্যালন ডি অর। এর ২ বছর পর প্রথম লাতিন আমেরিকান ও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি অর জয় করেন ব্রাজিলিয়ান রোনালদো।

ব্যালন ডি অর এর বিজয়ী নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এরপর আরও একবার আসে। সেটি ২০০৭ সালে। এবার ব্যালন ডি অর কে একেবারেই বৈশ্বিক পুরষ্কার করে দেয়া হয়। অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোন জায়গার যেকোন লীগ থেকেই ব্যালন ডি অর জিততে পারবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এজন্য ইউরোপিয়ান লীগে খেলার প্রয়োজন নেই!

ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন ও ফিফার সংমিশ্রণ

ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন দিতো ‘ব্যালন ডি অর’ ও ফিফা দিতো ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ পুরষ্কার। তবে ২০১০ সালে এসে তারা সিদ্ধান্ত নেয় একসাথে পুরষ্কার প্রদান করবে। আর সেজন্য এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেয়া হয় ‘ফিফা ব্যালন ডি অর’। প্রথমবারের মত একীভূত হওয়া পুরষ্কার টি জিতে নেয় বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার সুপারস্টার ফুটবলার লিওনেল মেসি। তিনি সর্বোচ্চ ৪ টি ফিফা ব্যালন ডি অর সহ মোট ৬ টি ব্যালন ডি অর জিতেন যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন ও ফিফার আলাদা হওয়া

২০১৫ সালের পর তারা আবারও সিদ্ধান্ত নেয় আলাদা আলাদা ভাবে পুরষ্কার প্রদান করার। তখন ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন আবার ব্যালন ডি অর নামে পুরষ্কার দিলেও ফিফা তাদের পুরষ্কারের নাম চেঞ্জ করে নতুন নাম দেয় ‘দ্যা বেস্ট’। ২০১৬ সালে এই ২ টি পুরষ্কারই জিতে নেন পর্তুগীজ সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলার

সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অর জিতেছেন আর্জেন্টিনা ও বার্সেলোনার লিওনেল মেসি। তিনি রেকর্ড ৬ বার এই পুরষ্কার টি জিতেছেন। তিনি শুধু সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অরই জিতেননি। সেই সাথে টানা সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অর জয়ের রেকর্ডও করেছেন। তিনি টানা ৪ বার ব্যালন ডি অর জিতেন ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত।

এছাড়াও বাকি ২ টি ব্যালন ডি অর জিতেন ২০১৫ ও ২০১৯ সালে। জেনে রাখা ভালো- মেসি হচ্ছে ইতিহাসের একমাত্র ব্যালন ডি অর জয়ী প্লেয়ার যে কিনা এই পুরষ্কার পাওয়ার সময়েও ওই বছরে তার ক্লাব থেকে একজন ফুটবলারও উক্ত বছরের সেরা একাদশে জায়গা পাননি। যা একটু অবিশ্বাস্যও বটে!

মেসির পরের জায়গায় ৫ টি ব্যালন ডি অর নিয়ে আছে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনি ম্যান ইউ ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মোট ৫ বার এই পুরষ্কার টি জিতেন। ২০০৮ সালে প্রথমবার এই পুরষ্কার জেতার পর তিনি আরও ৪ বার এই পুরষ্কার গ্রহণ করেন- ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭ সালে।

৩ বার করে ব্যালন ডি অর জয় করেন জোহান ক্রুইফ ও মিশেল প্লাতিনি। তবে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ৩ বার জিতেন মিশেল প্লাতিনি। ১৯৮৩-৮৫ পর্যন্ত ৩ বার এই পুরষ্কার জিতেন তিনি। ক্রুইফ ৩ বার জয় করে ১৯৭১, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে।

সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ী ক্লাবের ফুটবলার

এক ক্লাবের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৬ টি ব্যালন ডি অর মেসির। তাতে কোন ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অর জিতেছে মেসির বার্সেলোনারই। সর্বোচ্চ ১২ বার ব্যালন ডি অর জিতেছে এই ক্লাবের খেলোয়াড়গণ। মোট ৬ জন ফুটবলার মিলে ১২ বার জিতেছেন।

এছাড়াও রিয়াল মাদ্রিদ রয়েছে ২ নাম্বারে ১১ টি ব্যালন ডি অর নিয়ে। যেখানে ৭ জন ফুটবলার পুরষ্কারটি জিতেছে। এছাড়াও ৬ জন জুভেন্টাসের ফুটবলার মিলে ৮ বার জিতেছে, যা তৃতীয় সর্বোচ্চ।

সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ী দেশের খেলোয়াড়

সবচেয়ে বেশি ৭ বার ব্যালন ডি অর জিতেছে জার্মানির ফুটবলাররা। মোট ৫ জন প্লেয়ার জিতেছে এই পুরষ্কারটি। এছাড়াও সমান সংখ্যক বার পুরষ্কারটি জিতেছে নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের খেলোয়ারগণ। তবে তাদের হয়ে ৩ জন করে জিতেছে পুরষ্কারটি। এছাড়া ফ্রান্সের হয়ে ৪ জন মিলে ৬ টি ও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি একাই ৬ টি ব্যালন ডি অর জিতেছে।

এক বছরে ৩ জন একই ক্লাবের

একই ক্লাব থেকে ৩ জন ব্যালন ডি অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছে মাত্র ৩ বার। ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালে মিলানের হয়ে মনোনীত হয় মার্কো ভ্যান বাস্তেন, রুড গুলিত ও ফ্রাংক রাইকার্ড (১৯৮৮)।

পরের বছর একই ক্লাবের হয়ে মনোনীত হয় ভ্যান বাস্তেন, ফ্রাংকো বারেসি ও রাইকার্ড। যদিও ২ বারই ভ্যান বাস্তেনই পুরষ্কার টি জিতেন।

এছাড়াও ২০১০ সালে বার্সেলোনার থেকে মেসি, জাভি ও ইনিয়েস্তা মনোনীত হয় যেখানে পুরষ্কারটি জিতে নেয় জাভি।

গোলকিপার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন যিনি

একজন গোলকিপার ব্যালন ডি অর জিতবে, এটা বোধহয় কল্পনার মতই। অন্তত এই প্রজন্মে তো বটেই। তবে এই অকল্পনীয় ব্যাপারটি বাস্তবে পরিণত করেছিলেন লেভ ইয়াসিন। তর্ক-সাপেক্ষে সর্বকালের সেরা এই গোলকিপার ১৯৬৩ সালে ডায়নামো মস্কোর হয়ে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করে সেবার ব্যালন ডি অর জিতে নেয়। যা এখনও পর্যন্ত একমাত্র গোলকিপার হিসেবে ব্যালন ডি অর জয়ের অর্জন।

একই বছরে বিশ্বকাপ ও ব্যালন ডি’অর

একই বছরে বিশ্বকাপ সাথে ব্যালন ডি অর, যেন অবিশ্বাস্য এক অর্জন। এই তালিকায় কিন্তু নেই সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অর জয়ী মেসি কিংবা ২য় সর্বোচ্চ ব্যালন ডি অর জয়ী রোনালদো।

এই তালিকায় আছে শুধু একজনই। লাস্ট ডিফেন্ডার হিসেবে ব্যালন ডি অর জয়ী ফাবিও ক্যানাভারো। ২০০৬ সালে ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের সময় এই অনন্য কৃতিত্ব গড়েন তিনি। পাশাপাশি জুভেন্টাসের হয়েও অসাধারণ পারফর্ম করেন তিনি।

ব্যালন ডি অর যেমন শোভা পেয়েছে বড় বড় ফুটবলারদের হাতে, আবার তেমনি কিছু বড় বড় বড় নামও আছে যাদের হাতে কখনও ব্যালন ডি অর ওঠেনি। সেখানে অবশ্যই পেলে ও ম্যারাডোনার নামই সবার আগে থাকবে।

অবশ্য ব্যালন ডি অরের তৎকালীন নিয়মই যে তাদের হাতে কখনও ওঠার সুযোগ পায়নি। তাতে সম্ভবত তাদের চেয়ে বেশি আক্ষেপ ব্যালন ডি অরেরই থেকে যাবে। কারণ, তারা যে তুলে দিতে পারেনি মর্যাদাময় এই পুরষ্কারটি ইতিহাসের সেরা ২ জনেরই হাতে।

লিখেছেন- ফাহমিদা সুহা

Leave a Reply