ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে সাইবার বুলিং

সময় যত ধাবিত হচ্ছে তত পাল্টে যাচ্ছে সমাজচিত্র। বেড়ে চলছে প্রযুক্তি নির্ভরতা। এতে উপকারও যেমন হচ্ছে ততটাই হচ্ছে হয়রানি। সেই হয়রানিই রূপ নিচ্ছে সাইবার বুলিং নামক অপরাধে। বুলিং মানে কাউকে অপ্রীতিকর কথা বা বাজে ভাষায় কথা বলা। আর সাইবার বুলিং হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে কারো উপর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো। যা প্রযুক্তির ব্যবহারকে অনিরাপদ করে তুলছে।

গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সাইবার পুলিশ সেন্টারের ফেসবুক পেজে ১৭ হাজার ৭০৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আর সাইবার বুলিং এর শিকার যারা হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই কিশোর-কিশোরী। তা বললেও ভুল হবে, বেশির ভাগ সাইবার বুলিং এর শিকার এখন নারীরাই হচ্ছেন।

দেশে সাইবার বুলিং ও অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীর ৮০ শতাংশই নারী, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে সাইবার অপরাধী ও হ্যাকারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ১৭-১৮ বছরের কিশোর।

দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই ঘটছে বেশির ভাগ ঘটনা। ধর্মীয়, সামাজিক, প্রেম সংলগ্ন সমস্যা, এছাড়াও সন্দেহ থেকেও ঘটছে এসব অপরাধ। গত বছর মলি (ছদ্মনাম) নামের একটি মেয়ে সাইবার বুলিং এর শিকার হয়। ফেসবুকের মাধ্যমে একটি স্বাভাবিক ছবির সাথে অপ্রীতিকর ক্যাপশন যুক্ত করায় ছবিটি ভাইরাল হয়। এর মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হতে হয় মেয়েটিকে। এবং ধর্মান্তরিত সন্দেহে পোস্ট করা হয়। তারপর থানায় জিডি করে, মেয়েটিকে ওই আইডি অফ করে দিতে হয়। এছাড়াও অনেক ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা একটি মানুষকে মানসিক দূর্বল ও ভীত-সন্ত্রস্ত করে দিতে যথেষ্ঠ।

ফেসবুকে আরও একটি ঘটনা ঘটছে ইদানিং। লিংকের মাধ্যমে আইডি হ্যাক করা এবং ভিক্টিমের আইডি থেকে বাজে পোস্ট, মেসেজ দেয়া। শেষ অব্দি তা পৌঁছায় ব্ল্যাকমেইলে। এক্ষেত্রে অনেক সময় নগদ অর্থের দাবি করে থাকে হ্যাকাররা। তাই এমন কিছু আপনার পারসোনাল ইমেইলের ইনবক্সে প্রেরণ করা হলে অবশ্যই এড়িয়ে যাবেন।

প্রেমে বিচ্ছেদ এর পর প্রেমিকার অন্য জায়গায় বিয়ে হওয়ায় আক্রোশে গোপন ছবি / ভিডিও / তথ্য ভাইরাল হবার ঘটনাও ঘটেছে অনেক। এসব কিছুর প্রভাব গিয়ে পরে একটা পরিবারের উপর। অনেকে এইসব সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করে থাকেন।

ইউনিসেফের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া ৩৮ শতাংশ ১০-১৩ বছর বয়সের, ৩৬ শতাংশ ১৪-১৫ বছর এবং ১৬-১৭ বছর বয়সী ২৫ শতাংশ।

করোনার বেড়েছে অনলাইন তথা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। এবং সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাইবার ক্রাইম। এমন ঘটনার সম্মুখীন যেনো না হতে হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের সচেতনতা প্রয়োজন। যদি কখনও এমন পরিস্থিতিতে কেউ পরেন তবে করণীয় হিসেবে;

নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস হারাবেন না, নিজেকে দোষারোপ করবেন না এসবের জন্য।
যারা বা যে আপনাকে এমন অবস্থায় ফেলেছে তাদের পাল্টা জবাব সেই অবস্থায় দিবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
সাইবার বুলিং এর সকল ঘটনা তৎক্ষনাৎ প্রমাণ হিসেবে রাখবেন।

এ ধরণের পরিস্থিতিতে সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তির পরিবারের সবাইকে সেই সময়টায় ভিক্টিম এর পাশে থাকতে হবে। কোনোভাবেই তখন তাকে দোষারোপ করা যাবে না। এতে মানসিক ভাবে ভেঙে পরবে আরো। শেষ অব্দি তা জীবন সংকটেও রূপ নিতে পারে।
সর্বোপরি অবশ্যই নিজেকে আরও সচেতন করে তুলতে হবে ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের অন্যান্য সাইট ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
এই বিষয় গুলোতে থানায় জিডি করতে গেলে একা যাওয়াটা বোকামি হবে। কারণ তখন এতটা গুরুত্ব দেয়া হয় না বিষয়টাকে। অবশ্যই পরিবারের সদস্যকে সাথে নিয়ে যেতে হবে।
আর হ্যা, নিজের ব্যক্তিগত তথ্যাদি ইন্টারনেট মাধ্যমে কাউকেই শেয়ার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

শিশুরাও এসবের শিকার হচ্ছে

বেশ কিছু তথ্য ঘেটে একটি জরিপে দেখা গেছে, যারা ইন্টারনেটে গেম খেলছে তাদের সাইবার বুলিং এর শিকার হবার সম্ভাবনা সাধারণ ব্রাউজারদের থেকে বেশি। শুধু তাই না, সোশাল প্লাটফর্মে শিশুদের আরও যেসব আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে, বেশিরভাগই গালাগালি, বর্ণবাদী ও যৌনতা বিষয়ক। এগুলো ঘটে থাকে অন্ধবিশ্বাস থেকেই। ছেলেমেয়েদের অবুঝ আচরণ থেকেই আক্রমণ হতে হয় এসবের। শিশুদের জন্য এগুলোই বিশেষ কারণ।

সাইবার বুলিং সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা সবার থাকা দরকার। নিজে সচেতন হতে হবে, অন্যকে সচেতন করতে হবে। একই সাথে এগিয়ে যেতে হবে অন্যের বিপদে। মনে রাখবেন, প্রয়োজনের মূহুর্তে আপনার একটি সঠিক পদক্ষেপ বাঁচিয়ে দিতে পারে এক বা একাধিক নিষ্পাপ প্রাণ।

প্রাসঙ্গিক লেখা-