সিডিএন (CDN) কি এবং সিডিএন কিভাবে কাজ করে?

সার্চ ইঞ্জিন কিংবা পাঠক, উভয়ের মনতুষ্টির জন্য ওয়েবসাইটের স্পীড একটি বড় ফ্যাক্টর। স্পীডের সাথে সিডিএনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। প্রথম অবস্থায় সিডিএনের ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা এবং এক ধরণের চাপা ভয় কাজ করলেও বর্তমানে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন এর জন্য এটি বেশ প্রচলিত এবং কার্যকরী পদ্ধতি হয়ে দাড়িয়েছে। ওয়েবসাইটের স্পীডের ব্যাপারে যারা সচেতন, তারা প্রায় সকলেই ওয়েবসাইটে সিডিএন (CDN) যুক্ত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

নতুন অবস্থায় অনেকেই সিডিএনের গুরুত্ব ও কাজের ধরণ বুঝতে ভুল করে। কেউ কেউ অন্যদের দেখাদেখি নিজের ওয়েবসাইটে সিডিএন যুক্ত করলেও অধিকাংশরাই এটাকে বাড়তি ঝামেলা মনে করে। এর কারণ সম্ভবত, বাংলায় সিডিএন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার মতো কোনো আর্টিকেল না থাকা।

এই আর্টিকেলে সিডিএন কি এবং এর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার পাশাপাশি উল্লেখ করা হবে, কেন আমাদের ওয়েবসাইটে সিডিএন যুক্ত করা উচিৎ।

সিডিএন (CDN) কি এবং সিডিএন কিভাবে কাজ করে?

সিডিএন এর পূর্ণরূপ কনটেন্ট ডেলিভারী নেটওয়ার্ক। এটি মূলত অনেকগুলো সার্ভারের সংযোগে তৈরী করা এক ধরণের নেটওয়ার্ক, যা কোনো ওয়েবসাইটের সর্বশেষ ক্যাশ করা কনটেন্টসমূহ ভিজিটরের সামনে প্রদর্শণ করে।

সাধারণত, একজন ভিজিটর যখন আমাদের ওয়েবসাইটে ঘুরতে আসে, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়েবসাইটের মূল ওয়েব সার্ভারে ঢুকে যায়। যদি আপনি কোনো বাংলাদেশী লোকাল ওয়েব হোস্টিং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে হোস্টিং কিনে থাকেন, তবে সম্ভবত আপনার ওয়েবসাইটের সার্ভারটি বাংলাদেশের কোথাও অবস্থিত। আপনার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ, আমেরিকা বা ইউরোপ থেকে যারা ভিজিট করতে আসছে, তারা সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে থাকা আপনার ওয়েব সার্ভারে ঢুকে পড়ছে।

যদি কখনো আপনার ওয়েবসাইটে অনেক বেশি ভিজিটর প্রবেশ করা শুরু করে, তবে সার্ভার এক সময় ধীরগতির হয়ে যাবে। কারণ প্রতিটি সার্ভারের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা থাকে। ভিজিটরের সংখ্যা এই ধারণ ক্ষমতার যত কাছাকাছি যেতে থাকবে, সার্ভার ততই ধীরগতিসম্পন্ন হতে থাকবে এবং এক সময় সার্ভারটি সম্পূর্ণভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেবে। এ ধরণের অবস্থাকে আমরা বলি, সার্ভার ডাউন হওয়া।

আমাদের দেশের বিভিন্ন সরকারী ওয়েবসাইটে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দেখার সময় এই শব্দটি প্রায়ই আমাদের শুনতে হয়।

সিডিএনের চলন মূলত এধরণের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যেই শুরু হয়েছিল। প্রথমেই বলেছি, সিডিএন হলো অনেকগুলো সার্ভারের মাধ্যমে তৈরীকৃত নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ, ছোট ছোট সার্ভারের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল বড় সার্ভার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সিডিএনের ছোট ছোট সার্ভারগুলো পৃথিবীর এক স্থানে নয়, ছড়িয়ে থাকে সারা পৃথিবী ব্যাপী।

আপনি যখন আপনার ওয়েবসাইটে সিডিএন ব্যবহার করবেন, ওয়েবসাইটের সমস্ত কনটেন্ট (যেমনঃ ছবি, লেখা, স্টাইলশীট, আইকন, জাভাস্ক্রিপ্ট ইত্যাদী সমস্ত কিছু) সিডিএন এর নেটওয়ার্কে চলে যাবে। ফলে আপনার কনটেন্টগুলো জমা হয়ে যাবে পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা বিভিন্ন সার্ভারে।

যখন কোনো ব্যবহারকারী আপনার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে চাইবে, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার হোস্টিং সার্ভারে প্রবেশ না করে, প্রবেশ করবে সিডিএন নেটওয়ার্কের আওয়াতাধীন সবচেয়ে কাছের সার্ভারটায়।

উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, আপনার ওয়েবসাইটের হোস্টিং সার্ভারটি যদি ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত হয়ে থাকে এবং বাংলাদেশের সিলেট থেকে একজন ব্যবহারকারী যদি ওয়েবসাইটে ভিজিট করতে আসে, তবে সে সরাসরি চেন্নাইয়ে থাকা আসল সার্ভারটিতে ঢুকে পড়বে না। বরং সে ঢুকবে বাংলাদেশে থাকা সিডিএন নেটওয়ার্কের আওয়াতাধীন কাছের কোনো সার্ভারে, যা হয়তো ঢাকায় অবস্থিত। একই সময়ে আমেরিকা থেকে কোনো ভিজিটর আপনার ওয়েবসাইটে ঢুকতে চাইলে সে তার কাছের সিডিএন নেটওয়ার্কের আওতাধীন কোনো এক সার্ভারে ঢুকে আপনার ওয়েবসাইটটি দেখতে পাবে, যা হয়তো নিউইয়র্কে অবস্থিত।

আরও পড়ুন –

সিডিএন (CDN) কি সত্যিই ওয়েবসাইটের গতি বৃদ্ধি করে?

সিডিএন ব্যবহার না করা ওয়েবসাইটে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভিজিটর একই সার্ভারে এসে উপস্থিত হয়। ফলে সার্ভার এতো ভিজিটরকে সামলাতে হিমশিম খায়।

অন্যদিকে সিডিএন ব্যবহার করা ওয়েবসাইটে যেহেতু সার্ভার অনেকগুলো এবং অঞ্চল ভিত্তিক, তাই একই সার্ভারে সাধারণত সকল ভিজিটর এসে উপস্থিত হয় না। আর কোনো কারণে যদি, কোনো এক সার্ভারে অত্যাধিক ভিজিটর এসে পড়ে এবং সেটি এতো লোড না নিতে পেরে ডাউন হয়েও যায়, তাহলেও ওয়েবসাইটটি দৃশ্যমান থাকে। কেননা, সিডিএনের আওতায় থাকে অনেক অনেক সার্ভার। এতো সার্ভারের মাঝে একটা সার্ভার ডাউন হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য কোনো সার্ভার ভিজিটরদের সামলানোর দায়িত্ব পেয়ে যায়।

অতএব, এটা বলা যায় যে, সিডিএন ব্যবহার করা কোনো ওয়েবসাইট কখনো ডাউন বা বন্ধ থাকে না।

এবার গতির বিষয়ে আসি৷ সিডিএন ব্যবহার করে না – এমন কোনো ওয়েবসাটের মূল হোস্টিং সার্ভারটি যদি বাংলাদেশে স্থাপিত হয়, তবে বাংলাদেশের মানুষ ওই ওয়েবসাইটে যত দ্রুত প্রবেশ করতে পারবে, তত দ্রুত কি আমেরিকার মানুষেরা প্রবেশ করতে পারবে?

উত্তর হলো, না! পারবে না৷ কারণ বাংলাদেশের মানুষের হাতে থাকা মোবাইলের ব্রাউজারকে ঐ সার্ভারের কাছে রিকোয়েস্ট পাঠাতে খুব বেশি দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে না। কারণ সার্ভারটি বাংলাদেশেই অবস্থিত। কিন্তু আমেরিকায় থাকা মানুষটির ব্রাউজারকে রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর অপেক্ষা হবে অনেকক্ষণ, পাড়ি দিতে হবে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ।

এর ফলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ থেকে ঐ ওয়েবসাইটে ঢুকতে লাগছে মাত্র ২ সেকেন্ড, কিন্তু আমেরিকা থেকে ঐ একই ওয়েবসাইটে ঢুকতে লেগে যাচ্ছে ২০ সেকেন্ড! সময়ের ব্যবধান সকল ক্ষেত্রে এতো বেশি না হলেও পার্থক্য অবশ্যই থাকবে।

এই সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে সিডিএন অনেক বেশি কার্যকরী। কেননা, এটি ব্যবহার করলে আমেরিকার ঐ মানুষটার ব্রাউজারকে বাংলাদেশে থাকা মূল সার্ভারে রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে না, রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে আশেপাশের কোনো সিডিএনের আওয়াতাভুক্ত সার্ভারে। ফলে পৃথিবীব্যাপী যেকোনো অঞ্চল থেকে উক্ত ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে প্রয়োজন হবে খুবই সামান্য সময়ের।

তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিডিএন ওয়েবসাইটের গতি সত্যিই বৃদ্ধি করে!

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কিছু সিডিএনের নামের তালিকা –

১. StackPath
২. Sucuri
৩. Cloudflare
৪. KeyCDN
৫. RackSpace
৬. Google Cloud CDN
৭. CacheFly
৮. Amazon Cloud Front

ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েবসাইটে সিডিএন ব্যবহারের খরচ

সিডিএনের খরচ সত্যিই অনেক বেশি। অনেক অনেক বেশি। বেশিরভাগ সিডিএনই হোস্টিং এর মতো মাসিক ভাতার বিনিময়ে ওয়েবসাইটে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু, একটা সুখবর আছে। সুখবরটি হলো, আপনি চাইলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যেও সিডিএনের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন!

ক্লাউডফ্লেয়ার (CloudFlare) এর নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। না শুনলেও ভালো করে শুনে নিন, মনে গেঁথে নিন। ক্লাউডফ্লেয়ার প্রিমিয়াম প্যাকেজের বেশ কয়েক ধরণের সিডিএনের পাশাপাশি দিচ্ছে “ফ্রি” সিডিএন প্যাকেজ!!!

“ফ্রি” তে দিচ্ছে শুনে মনে হতে পারে, ফ্রি এর জিনিস কত আর ভালো হবে! কিন্তু না, ক্লাউডফ্লেয়ারের ফ্রি প্যাকেজে সেই সব কিছু আছে, যা আমাদের প্রয়োজন। সিকুইরিটি থেকে শুরু করে স্পীড – সব ধরণের সুবিধা আপনি পাবেন ক্লাউডফ্লেয়ারের এই ফ্রি প্যাকেজে।

এখানে বলে রাখা ভালো, ক্লাউডফ্লেয়ারের ফ্রি প্যাকেজের মতো ঐ একই ধরণের সুবিধা অন্য অনেক সিডিএন সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দিয়ে আসছে।

ক্লাউডফ্লেয়ার এর ফ্রি সিডিএন কিভাবে নিজের ওয়েবসাইটে যুক্ত করা যায়, কেন ক্লাউডফ্লেয়ারই আপনার ব্যবহার করা উচিৎ – সে সবকিছু নিয়েই অতি দ্রুত আমরা আলাদা আর্টিকেল প্রকাশ করব।

সিডিএন কি আপনার ওয়েবসাইটে যুক্ত করতেই হবে?

আপনি যদি কোনো আন্তর্জাতিক মানের ওয়েবসাইট চালান এবং আশা করেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিটর আসবে, তাহলে সিডিএন অবশ্যই অবশ্যই ব্যবহার করুন। কেননা, এতে পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে আপনার ওয়েবসাইটে মানুষ দ্রুত ঢুকতে পারবে। অর্থাৎ ওয়েবসাইটের স্পীড ঠিক থাকবে।

যদি আপনার ওয়েবসাইটে প্রচুর পরিমাণে ভিজিটর থাকে এবং হোস্টিং এর ব্যান্ডউইথ কম থাকে, তবে অবশ্যই সিডিএন ব্যবহার করতে হবে। এতে সার্ভার ডাউন হওয়ার আশংকা কমে যাবে।

কিন্তু, যদি আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিটর কম থাকে এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষকে উদ্দেশ্য করে ওয়েবসাইটটি রান করা হয়, তবে সিডিএনের তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই।

মনে করুন, আপনার ওয়েবসাইটটি বাংলা ভাষায় লিখিত। তাহলে আপনার টার্গেট নিশ্চয়ই ইউরোপ আমেরিকায় অবস্থানরত মানুষ হবে না। হবে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের মানুষ। তাই এক্ষেত্রে আপনার ওয়েব হোস্টিং সার্ভারটি যদি বাংলাদেশে অবস্থিত হয়, তাহলে সিডিএনের খুব বেশি প্রয়োজন হবে না। তবে ভিজিটর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিডিএন নিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষ কথা

এখনকার বেশিরভাগ ওয়েবসাইটেই সিডিএনের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। সিডিএনের মাধ্যমে একেকটা ওয়েবসাইটের সার্ভার পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিষয়টা সত্যিই অভাবনীয়।

সিডিএন সুবিধাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আজকাল সিডিএনে স্পীড ও সার্ভার নির্ভর সুবিধা সরবরাহের পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত সুবিধাও যোগাচ্ছে। এর ফলে ডিডোস এ্যাট্রাক, ফেইক ট্রাফিকসহ নানারকম সমস্যায় ভালো ফল পাওয়া যায়।

ক্লাউডফ্লেয়ারের সিডিএনযুক্ত কোনো ওয়েবসাইটে যদি ফেইক ট্রাফিক বট আসে, সিডিএন সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বুঝতে পারে এবং গুগল রিক্যাপচার বসিয়ে দেয়। ফলে বট আর আগাতে পারে না।

এছাড়াও, সিডিএন একটা ওয়েবসাইটের ব্যান্ডউইথ কমিয়ে রাখতে কতটা ভূমিকা রাখে, তা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন।

ব্যক্তিগতভাবে সিডিএন ব্যবহার করে আমি বেশ আনন্দিত। আমার প্রতিটি বাংলা ইংরেজী ম্যাক্রো ও মাইক্রো নিশভিত্তিক প্রজেক্টে শুরতেই সিডিএন যুক্ত করে নিয়েছি। চাইলে আপনিও চেখে দেখতে পারেন।

আশা করছি, পুরো আর্টিকেলটি পড়ে ফেলার পর সিডিএন কি এবং সিডিএন কিভাবে কাজ করে – সবকিছু পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছেন। সিডিএন নিয়ে আমরা ভবিষ্যতে আরো আলোচনা করব সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং আমাদের সঙ্গে থাকুন।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে নিতে পারেন-