ইতিহাসের সেরা অল-রাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস

সম্ভবত তিনি জন্মেছিলেন ভুল দেশে, কিংবা তাকে নিয়ে মানুষের চর্চা হয়েছিল কম। তিনি জ্যাক ক্যালিস, তিনি আফ্রিকান ক্রিকেট লিজেন্ড।

অল-রাউন্ডার কথাটা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে স্যার গ্যারি সোবার্স, পাকিস্তানের ইমরান খান, ভারতের কপিল দেব, ইংল্যান্ড এর স্যার ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হ্যাডলি, সনাথ জয়সুরিয়া, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, শহীদ আফ্রিদি, আমাদের সাকিব আল হাসান এবং বর্তমান সময়ের বেন স্টোকসের নাম!

কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়-

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার কে?

তবে ওই জায়গায় এখানের কেউই থাকবে না, থাকবে একজনের নাম- জ্যাক হেনরি ক্যালিস! আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পান নি, কিন্তু পরিসংখ্যান যে পুরোটাই তার পক্ষে কথা বলে।

যদি তিনি ভারত, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডে জন্মাতেন তবে মিডিয়ার হাইলাইট তাকে করে তুলতো সর্বকালের সেরা ‘ক্রিকেটার’!

হ্যা আপনি ঠিকই পড়েছেন, মিডিয়া তাকে করে তুলতো সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।

মিডিয়ার প্রয়োজন নেই। তার পরিসংখ্যানই কিন্তু তার পক্ষে কথা বলবে। তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার যার নামের পাশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৫ হাজারের উপরে রান, সাথে আছে ৫০০ এর উপরে উইকেট!

একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ওয়ানডে ও টেস্ট ২ ফরম্যাটেই ১০ হাজারের উপরে রান ও ২৫০ এর উপরে উইকেট নিয়েছেন!

এগুলো যেন ভাবনাতেই মানায়, বাস্তবতা শুধুই জ্যাক ক্যালিসের নামের পাশে! শুনলে অবাক হবেন যদি আপনি আজকেই প্রথম পড়ে থাকেন।

ভারতের এক সময়ের ব্যাটিং ও বোলিং কান্ডারি ছিল শচীন টেন্ডুলকার এবং জহির খান। এই ২ জনের ব্যাটিং ও বোলিং গড়ের প্রায় কাছাকাছি ছিল একাই জ্যাক ক্যালিসের ব্যাটিং ও বোলিং! এমনকি রান ও উইকেট সংখ্যাও ছিল তাদের প্রায় সমান সমান।

এর মানে কি দাঁড়ালো? দলে একজন জ্যাক ক্যালিস থাকা মানে ঠিক ২ জনকে নিয়ে খেলা। যেমনটা এখন আমরা অনুভব করি সাকিব আল হাসান কে নিয়ে খেলার সময়!

মজার ব্যাপার জানেন? জ্যাক ক্যালিসের ব্যাটিং গড় তো শচীনের চেয়ে বেশিই ছিল! শুধু বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলতে না পারার কারনে তার নামের পাশে যুক্ত হয়নি আরও কিছু রান। নয়ত কে জানে, দেখা যেত তার ক্যারিয়ার শেষে সর্বোচ্চ টেস্ট রানের মালিক জ্যাক ক্যালিস!

১৯৯৫ সালে শুরু করা ক্যারিয়ারে ইতি ঘটে ২০১৩ সালে, অর্থাৎ ১৮ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে তার শুরুটা ছিল না তার পুরো ক্যারিয়ারের মত পরিষ্কার। পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক বড় পথ!

ঘরোয়া ক্রিকেটে রান আর উইকেটের ফোয়ারা ছোটানোর পর প্রথমবারের মত জাতীয় দলে জায়গা পান ১৯৯৫ সালে। প্রথমে দলে ডাক পেলেও নিষ্প্রভ ছিলেন ব্যাট ও বল হাতে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের মাঠে তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি।

একই সিরিজে ওয়ানডেতেও অভিষেক হয়ে যায় তার। কিন্তু টেস্ট ও ওয়ানডে ২ সিরিজেই প্রায় ফ্লপ ছিলেন তিনি।

ফলাফল দল থেকে বাদ পরা। তবে দলে আবার জায়গা করে নেন ১৯৯৬ সালে। সেবার যেন পাকাপোক্ত করেই ঢোকে জাতীয় দলে। দলের সাথে ছিলেন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে।

তবে বিশ্ব তার আসল জাদু দেখে ১৯৯৮ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। সেবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ২টি ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরষ্কার জিতেন তিনি। শুধু ব্যক্তিগত অর্জনেই থেমে ছিলেন না। সাথে জিতে নিয়েছিলেন আফ্রিকার হয়ে একমাত্র আইসিসি থেকে কোন পুরষ্কার। এখনও পর্যন্ত আইসিসি ইভেন্টে এটিই তাদের একমাত্র অর্জন।

২০০০ সালে ভারতের বিরুদ্ধে তাদের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় করে সাউথ আফ্রিকা, যেখানে সর্বোচ্চ অবদান ছিল তার। এই সিরিজ জয়ে তিনি হন ম্যান অব দ্য সিরিজ।

জ্যাক ক্যালিস হচ্ছে ইতিহাসের ৪ জন ক্রিকেটারের মধ্যে একজন যিনি টানা ৫ টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করার বিরল রেকর্ড গড়েন। বাকি ৩ জন ক্রিকেটার হচ্ছেন স্যার ডন ব্রাডম্যান, মোহাম্মদ ইউসুফ ও গৌতম গাম্ভীর।

তার ক্যারিয়ারের পিক টাইম শুরু হয় ১৯৯৯ সাল থেকে। তবে আরও বেশি সেরা সময় আসে ২০০৪, ২০০৫ সালের দিকে যখন সে আইসিসির সেরা টেস্ট ও ওয়ানডে একাদশে জায়গা করে নেন।

২০০৫ সালে তৎকালীন দ্রুততম টেস্ট ফিফটি করেন জ্যাক ক্যালিস। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ২৪ বলে ৫০ করেন তিনি। ২০০৭ সালে তিনি ৪ টেস্ট ম্যাচে ৫ টি সেঞ্চুরি করেন! একই বছর বিশ্বকাপে আফ্রিকার হয়ে সর্বোচ্চ ৪৮৫ রান করেন, যেখানে তার গড় ছিল ৮০.৮৩! যেটা কোন বিশ্বকাপে তার সেরা পারফর্মেন্স।

ক্রিকেট মাঠে জ্যাক ক্যালিসের অসংখ্য রেকর্ড রয়েছে যা শুধু সবার জন্য স্বপ্নই। শুধু আফ্রিকার ক্রিকেটার বলেই হয়ত মিডিয়ার লাইমলাইট ঠিকমত পাননি। ২০১০, ২০১১ এবং ২০১২ সালে টানা তিনি আইসিসি বর্ষসেরা একাদশে জায়গা করে নেন। সাথে ২০১৩ সালে উইজডেন ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করা হয়।

ক্যালিস হচ্ছেন গুটিকয়েক খেলোয়ারদের একজন যিনি তার ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করার বিরল রেকর্ড গড়েন। ২০১৩ সালে ডারবানে ভারতের বিরুদ্ধে ২য় টেস্টে সেঞ্চুরি করে ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি।

সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন তো সরাসরি ঘোষনাই দিয়েছেন যে, তার দেখা সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান এবং ক্রিকেটার হচ্ছে জ্যাক ক্যালিস। এছাড়াও আরেক ইংলিশ ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেনের চোখেও তিনিই সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।

চলুন জেনে নেই-

জ্যাক ক্যালিসের কিছু অনন্য কীর্তি সম্পর্কে

  • টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রেটিং/পয়েন্ট ৯৩৫!
  • টেস্ট অল রাউন্ডার হিসেবে সর্বোচ্চ রেটিং ৬১৬।
  • প্রথম ও একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডে ও টেস্ট ফরম্যাটে ১০ হাজারের উপরে রান ও ২৫০ এর উপরে উইকেট নেয়া ক্রিকেটার।
  • একমাত্র ক্রিকেটার যিনি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ৫ উইকেট শিকার করেছেন।
  • একমাত্র বোলার যে আইসিসি কোন ইভেন্টের ফাইনালে ৫ উইকেট নিয়েছে।
  • একমাত্র ক্রিকেটার যিনি আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছে সাথে একই টুর্নামেন্টে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টও হয়েছে।
  • টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ২৩ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরষ্কার জিতেছেন তিনি, তার চেয়ে বেশি আর কেউ জিতেনি।

ইঞ্জুরি ভাগ্য

খুব কম ক্রিকেটারই থাকে যাদের জীবনে ইঞ্জুরি বড় থাবা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সেই কম ক্রিকেটারের তালিকায় ভাগ্য ছিল না জ্যাক ক্যালিসের। ইঞ্জুরি তার এই অসাধারন ক্যারিয়ারে কয়েকবারই থাবা দেয়। তবে তিনি প্রতিবারই ফিরে আসেন বীরের মত করে। ইঞ্জুরি থেকে ফিরে এসে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও আছে তার!

ক্লাব ক্যারিয়ার

ক্রিকেটারদের জীবনের অনেক বড় একটা অংশ কেটে যায় ক্লাব ক্রিকেটে। বর্তমান সময়ে তো অনেক ক্রিকেটার দ্রুত অবসরই নিয়ে নেয় ঘরোয়া লীগ খেলার জন্য। খুব একটা ব্যতিক্রম ছিলেন না জ্যাক ক্যালিসও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার পর একটানা ২ বছর পর্যন্ত চালিয়ে যান ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলা, বিশেষ করে আইপিএল।

ঘরোয়া ক্রিকেটে তার শুরুটা ছিল ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের হয়ে। যা ছিল তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। তার কারন হচ্ছে, এখানেই রানের ফোয়ারা ছুটিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়গা পান তিনি।

১৯৯৭ সালে ক্লাব পরিবর্তন করে তিনি যোগ দেন মিডলসেক্সে। যদিও সেখানে বেশি দিন খেলেননি তিনি। আফ্রিকান লীগে খেলেছেন কেপ কোবরার হয়ে এবং বিগ ব্যাশে খেলেছেন সিডনি সিক্সার্সের হয়ে। ঘরোয়া টিটুয়েন্টিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় লীগ আইপিএলও মাতিয়েছেন তিনি। খেলেছেন ২টি দলের হয়ে। ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত খেলেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার ব্যাঙ্গালোরের হয়ে যেখানে প্রথম সিজনে খেলেছিল ফাইনাল।

তবে ২০১১ সালে কোলকাতা যোগ দেয়ার পর যেন আইপিএল ভাগ্যই বদলে যায়। ২০১২ ও ২০১৪ সালে জিতে নেন আইপিএল শিরোপা।

ক্রিকেটে তার যত অর্জন, সেই তুলনায় তাকে দুর্ভাগা বললে খুব একটা অন্যায় হবে না। কারন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অর্জন অনুযায়ী তাকে করা উচিত ছিল সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। কিন্তু সেই তকমা তিনি পান নি! কে জানে হয়ত ভারত, ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় জন্মালে মিডিয়ার বদৌলতে পেয়েও যেতে পারতেন!

পড়ে দেখার মতো কিছু লেখা-

  • আফ্রিকার দেশ উগান্ডার পরিচিতি ও আদ্যোপান্ত
    উগান্ডা শব্দটি শুনলে হয়তো আপনার মাথায় খেলা করে চরম দরিদ্রতায় ভোগা একটি দেশের ছবি৷ অথবা চোখে ভেসে উঠে সাধাসিধে কালো মানুষের চওড়া হাসিমুখ। তবে সত্যটা হচ্ছে আমরা বেশিরভাগ মানুষই এই দেশটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানিনা। প্রচলিত তথ্যগুলোর বাইরে আসলে কি আছে উগান্ডায়? চলুন জেনে নেওয়া যাক উগান্ডা দেশটির আদ্যোপান্ত!
  • ব্যালন ডি’অর এর ইতিহাস
    বর্তমান ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরষ্কারের নাম বললে প্রথমেই যেসব পুরষ্কারের নাম মাথায় আসবে সেগুলো হচ্ছে- ব্যালন ডি’অর, ফিফা দ্যা বেস্ট ও উয়েফা বেস্ট। তবে এদের মধ্যে সেরা কোনটা তা নির্ধারণে বোধহয় বেশি আলোচনা হবে ফিফা দ্যা বেস্ট ও ব্যালন ডি’অর নিয়ে। কারন দ্যা বেস্ট এর বিজয়ী নির্ধারণ করে ফিফা। তবে, তা স্বত্বেও ব্যালন ডি’অর … Read more
  • এই প্রজন্মের সেরা ক্রিকেটার বিরাট কোহলি
    বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার কে? কেউ বলবে মেসি কেউবা রোনালদো! কিন্তু যদি প্রশ্ন টা হয় ক্রিকেটে, কে বিশ্বসেরা? তাতে মনে হয়না খুব একটা দ্বিমত আসবে বিরাট কোহলির নাম নিয়ে। আচরণের জন্য তাকে অনেকে পছন্দ না করলেও ক্রিকেটার হিসেবে তিনি যে সেরা তাতে কারোরই সন্দেহ থাকার কথা নয়, উচিত নয়।
  • ক্রিকেট খেলার অতীত ও বর্তমান
    যতদূর জানা যায়, ক্রিকেট খেলাটির যাত্রা ১৫৯৮ সালে শুরু হয়েছিল বলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেটি অনুসারে ১৫৫০ সালের দিকেও খেলাটি প্রচলিত ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের আসল উৎপত্তি কবে, কোথায় হয়েছিল, তা এখনও এক রহস্য। তবে বেশিরভাগ মতই বলছে ক্রিকেটের জন্ম হয় ইংল্যান্ডে। মোটামুটি দৃঢ়ভাবেই বলা যায় যে, ১৫৫০ সালের আগেও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কেন্ট, সাসেক্স … Read more
  • বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা অধিনায়কের বীরত্বগাঁথা
    ওয়ানডে, টেস্ট আর টি–২০’র ১৬ বছরে দুই হাটুতে সাতবার অপারেশন। সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারে দশ বার ডাক্তারের ছুরির নিচে নিজেকে সঁপে দেয়া। প্রতি ম্যাচ শেষে সিরিজ দিয়ে টেনে বের করতে হয় হাটুতে জমা বিষাক্ত রস। ঘুম থেকে সঙ্গে সঙ্গে নামতে পারেন না বিছানা থেকে। হাটু দু’টোকে কয়েকবার ভাঁজ করতে হয়, সোজা করতে হয়, তারপর শুরু হয় দিন। … Read more

Leave a Comment