স্মার্টফোন নিরাপদ রাখার ৭টি কার্যকরী উপায়

আধুনিক সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো স্মার্টফোন। যা আমাদের জীবনের সাথে ওতো-প্রোতোভাবে জড়িয়ে গেছে। এটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সবচেয়ে ব্যবহৃত একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস। যদিও সময়ের সাথে সাথে স্মার্টফোনে উন্নতসব ফিচার যুক্ত করা হচ্ছে তবুও এর প্রাইভেসি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।

এতে আমাদের প্রায় সকল অ্যাকটিভিটি রেকর্ডেড থাকে। অথচ এর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা অধিকাংশ মানুষই উদ্বিগ্ন নই। স্মার্টফোনে আমাদের বিভিন্ন সেনসেটিভ ডেটা থাকে। যেমন- ব্যাংক একাউন্ট থেকে শুরু করে অডিও, ভিডিও, ছবি ও ব্যক্তিগত ম্যাসেজ। যা আমরা কখনোই চাইবো না অন্য কারো হাতে লাগুক।

তবে অসাবধানতাবশত বা না জেনে আমরা অধিকাংশ মানুষ স্মার্টফোনকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি। যা প্রতিপক্ষ বা হ্যাকারদের হাতে লাগলে কিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যাক্তিগত তথ্যের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার হয়ে যেতে পারি যেকোনো সময়!

আর এমন সব অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে বাঁচতে, স্মার্টফোন নিরাপদ রাখার বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা ও সেগুলো মেনে চলা খুবই জরুরী। তাই আজকের আর্টিকেলটিতে থাকছে স্মার্টফোন নিরাপদে রাখার ৭টি কার্যকর উপায়।

চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক –

Smartphone নিরাপদ রাখার ৭টি কার্যকরী উপায়


০১। স্মার্টফোনটি যেনো সবসময় লক থাকে তা নিশ্চিত করুন

এখন এটা অনেকটা বেসিক শোনালেও, পিউ রিসার্চ সেন্টারের রিসার্চ মোতাবেক ২৮% স্মার্টফোন ব্যবহারকারী’ই তাদের ফোনে কোনো স্ক্রিন লক ব্যবহার করেন না। যা আসলেই উদ্বিগের বিষয়।

আনলক স্মার্টফোন হারিয়ে ফেললে বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে লাগলে বা চুরি হয়ে গেলে খুব সহজেই তারা ফোন থেকে কনফিডেনসিয়াল ডেটা নিয়ে আমাদের ক্ষতি করতে পারে।

অপরদিকে যদি ফোন লক করা থাকে তাহলে আনলক করতে বেশ কিছুক্ষন সময় লাগবে আর সে সময়ের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক একাউন্ট ব্লক করা যাবে সাথে ডিভাইসটিও ট্র‍্যাক করা যাবে।

তাই অবশ্যই অবশ্যই আপনার স্মার্টফোনে লক দিয়ে রাখুন। স্মার্টফোন লক করার সময় অনেকেই ৪ ডিজিটের সংখ্যা ব্যবহার করে থাকে যা মোটেও উচিত না। এর পরিবর্তে লেটার ও ডিজিট মিক্স করে বড় ধরনের ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।

এছাড়াও অনেক এডভান্সড লক অপশন আছে। যেমনঃ- ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেইসলক। এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর মধ্যেই ফিঙ্গারপ্রিন্টই শ্রেয়।

০২। নিরাপদ ব্রাউজার ব্যবহার করুন

আমরা প্রতিনিয়ত প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে ব্রাউজারের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সার্চ করে থাকি। আর সে ব্রাউজারে যদি যথাযথ নিরাপত্তা না থাকে তাহলে শুধুমাত্র ওয়েবসাইট ভিজিটের মাধ্যমেও আমরা হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারি।

অথচ, সঠিক ব্রাউজার নির্বাচনেও আমরা দ্বিতীয়বার ভাবি না। কিছু জনপ্রিয় ব্রাউজারের উপর ভরসা করে বসে থাকি। উদাহরন স্বরূপ- গুগল ক্রোম ব্রাউজারের কথা বলা যেতে পারে। এটি সবচেয়ে ব্যবহৃত ব্রাউজার হলেও এতে বিভিন্ন সিকিউরিটি ইস্যু রয়েছে। যেমনঃ-এটি এডভার্টাইজিং এর জন্য আমাদের প্রায় সকল ডেটা কালেক্ট করে ও সেগুলো রেকর্ডেড রাখে।

গুগল ক্রোম, সাফারি, মাইক্রোসফট এ্যাজ ও ওপেরা’র পরিবর্তে বেশি সিকিউরড ব্রাউজার যেমনঃ- Brave Browser, Tor Browser, Firefox Browser, Iridium browser, Epic privacy Browser, DuckDuckGo, Vivaldi ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।

সব ব্রাউজারেই কম বেশি সুবিধা-অসুবিধা আছে। তবে এগুলো তুলনামূলক নিরাপদ। এছাড়াও নিরাপত্তা নিয়ে আপোষ করতে না চাইলে সাবস্ক্রিপশনে – Surfshark, ExpressVPN, NordVPN এর মধ্যে যেকোনো একটি ভিপিএন নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ব্রাউজিং এ আপনি শতভাগ সুরক্ষিত থাকতে পারবেন।

০৩। ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ ব্যবহারে সচেতন হোন

আজকাল হোটেল থেকে শুরু করে কফিশপ ও সুপারমার্কেট সবখানেই ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে। এসব পাবলিক ওয়াইফাইয়ে এনক্রিপশন ও নিরাপত্তায় অনেক ঘাটতি থাকে। যার সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা স্মার্টফোন হ্যাক করে সব ডেটার একসেস নিয়ে নিতে পারে।

তাই এসব পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারে সচেতন হওয়া দরকার। নাহলে আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুহুর্তেই অন্য কারো কাছে চলে যাবে।

যাদের পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার একান্ত দরকার হয়, তারা ভালো মানের ভিপিএন (ভার্চুয়াল পারসোনাল নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করতে পারেন। ওয়াইফাই এর মতো ব্লুটুথও আপনার স্মার্টফোনকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ব্লুটুথের মাধ্যমে আমরা এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে সহজে ঝামেলাহীন ভাবে ডেটা আদান-প্রদান করতে পারি। নিঃসন্দেহে এটি একটি অসাধারণ ওয়্যারলেস টেকনোলজি। তবে অধিকাংশ মানুষই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবগত না। ব্লুটুথ খুব সহজেই হ্যাক করা যায়।

এটি হ্যাক করে মুহূর্তেই আমাদের স্মার্টফোনের সকল ডেটা নিয়ে নিতে পারে হ্যাকাররা। তাই এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার।

ব্লুটুথ হ্যাকিং থেকে স্মার্টফোনটি নিরাপদ রাখতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলুন-

  • দরকার ছাড়া ব্লুটুথ অন রাখা থেকে বিরত থাকুন।
  • ব্লুটুথ সেটিংস Not discoverable করে রাখুন।
  • এর মাধ্যমে সেনসেটিভ ডেটা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • পাবলিক প্লেসে পেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন ও কাজ শেষে সব ডিভাইস অবশ্যই ডিসকানেক্ট করে দিন।

০৪। অ্যাপস ডাউনলোডের ক্ষেত্রে সচেতন হোন।

যেকোনো অ্যাপস অফিসিয়াল সোর্স থেকে ডাউনলোড করার বিষয়টিতো আমরা সবাই কম বেশি জানি। যারা না জানেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখা ভালো- আনঅফিসিয়াল সোর্স থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করা আর নিজের পায়ে কুঠারাঘাত করা একই কথা।

কারন, এসব অ্যাপসগুলো বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ও ম্যালওয়ার দ্বারা ভরপুর। যা আপনার স্মার্টফোনটির দফারফা করে ছাড়বে। পাশাপাশি অফিসিয়াল সোর্স থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করলেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত। যেমনঃ- অ্যাপসগুলোকে আপনার থেকে কী কী বিষয়ের একসেস নিচ্ছে। পাশাপাশি খেয়াল রাখবেন অ্যাপসের অ্যাকটিভিটির সাথে যায় না এমন কোনো অ্যাকসেস আপনি দিচ্ছেন নাতো?

উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে- কোনো ক্যামেরা রিলেটেড অ্যাপ ডাউনলোড করতে গেলে বা ডাউনলোডের পরবর্তীতে সেটা যদি
আপনার কাছ থেকে লোকেশন / ম্যাসেজ / কলের অ্যাকসেস চেয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ঝামেলা আছে। সেসব অ্যাপস ব্যবহার না করাই উত্তম।

এছাড়াও যখনই কোনো অ্যাপের আপডেট ভার্সন আসে তখনই সেটি আপডেট করে নেয়া ভালো। অ্যাপের পুরোনো ভার্সনে কোনো সিকিউরিটি ইস্যু থাকলে বা নতুন কিছু সংযোজন করার হলে সেটির আপডেট ভার্সন আনা হয়; যা ব্যবহারে নিরাপত্তা ঝুঁকি কম।

০৫। স্ট্রং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন

স্মার্টফোনে আমরা অহড়হ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে থাকি। ব্যাংক একাউন্ট, লক স্ক্রিন ও গুগল একাউন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোশাল একাউন্ট সবক্ষেত্রেই পাসওয়ার্ড লাগে। এতো এতো পাসওয়ার্ড মনে রাখা কিছুটা কষ্টসাধ্য। তাই অলসতাবশত অধিকাংশ মানুষই একটি পাসওয়ার্ড বারবার ব্যবহার করে; যা স্মার্টফোনকে অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দেয়।

অপরদিকে যারা আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে তুলনামূলক সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। একটি পাসওয়ার্ড পুনরায় ব্যবহার করা বা সহজ পাসওয়ার্ড দুটোই পরিহার করা উচিত।

দুর্বল পাসওয়ার্ড স্মার্টফোনকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। কারণ একটি একাউন্ট হ্যাক করার মাধ্যমে অন্যসব একাউন্টেও একসেস নিয়ে নিতে পারে হ্যাকাররা বা সহজে অনুমান করা যায় এমন পাসওয়ার্ডও হ্যাকিং করা সহজ।

তাই এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন যা অন্যদের জন্য অনুমান করা অসম্ভব। অপরদিকে আপনার জন্য সহযে অনুমেয়। পাসওয়ার্ড নির্বাচন করার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন সেটি যেনো বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, ডিজিট ও বিভিন্ন সিম্বল এর সমন্বয়ে হয়।

০৬। ফাইল শেয়ারিং অ্যাপস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন

ফাইল শেয়ারিং অ্যাপস গুলোতে অনেক ত্রুটি থাকে, আবার শেয়ার করার জন্য বিভিন্ন ধরনের একসেস দিতে হয়। এসব ত্রুটিজনিত কারনে একসেস দেওয়ার সময় এসব অ্যাপস বিভিন্ন থার্ড পার্টিকেও একসেস দিয়ে ফেলতে পারে।

এসব থার্ড পার্টি গুলো যদি একবার একসেস পেয়ে যায় তাহলে তারা যেভাবে খুশি সেভাবে আমাদের স্মার্টফোন কন্ট্রোল করতে পারবে। অর্থাৎ, আমাদের স্মার্টফোনের সব কিছুর একসেস তাদের কাছে থাকবে।

এছাড়াও এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ফাইল শেয়ার করার সময় কোনো একটি ডিভাইসে যদি ম্যালিসিয়াস কিছু থাকে সেটা অন্য ডিভাইসেও ছড়িয়ে পরতে পারে।

প্রায় সবধরনের শেয়ারিং অ্যাপসেই বিভিন্ন ত্রুটি থাকে যা স্মার্টফোনকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। শেয়ারিং এর জন্য এসব অ্যাপস না ব্যবহার করাই উত্তম।

০৭। এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করুন

স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেমে অনেক ধরনের ত্রুটি ও দুর্বলতা থাকে যেগুলো ডেভলপাররা ক্রমাগত ডেভলপ করে সেগুলোর আপডেট ভার্সন নিয়ে আসেন। আমরা প্রায়ই এগুলো এড়িয়ে যাই বা দেরি করে আপডেট করি; যা স্মার্টফোনকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।

ল্যাপটপ, ডেস্কটপের মতো স্মার্টফোন ক্রমাগত উন্নত করা হলেও এতে যতো বেশি উন্নত ফিচার যুক্ত করা হচ্ছে, সাইবার ক্রিমিনালরা ততো বেশি সেগুলোকে ভেদ করার কৌশল বের করে ফেলছে।

এমনকি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেটার একসেস নেওয়ার জন্য প্রফেশনাল ক্রিমিনালরা ইনভেস্ট করতেও প্রস্তুত।

অপারেটিং সিস্টেমের দুর্বলতা ছাড়াও ম্যালওয়্যার ও অপ্রয়োজনীয় অ্যাপস স্মার্টফোনের লোকেশন ট্র‍্যাক, ক্যামেরা একসেস, অডিও / ভিডিও রেকর্ডিং, কল ও ম্যাসেজ পড়া ইত্যাদি কাজগুলো করতে পারে।

কাজেই সব হারিয়ে বসার আগেই স্মার্টফোনের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার। আর এজন্যই এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করা অত্যাবশকীয়। স্মার্টফোনের সুরক্ষা নিয়ে আপোষ করতে না চাইলে যেকোনো ভালো মানের একটি এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করুন।

আরও পড়ুন-