5G আসলে কি – আসুন মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে জানি

5G আসলে কি - আসুন মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে জানি

5জি তে G মানে ‘জেনারেশন’। 5জি মোবাইল নেটওয়ার্কের পঞ্চম প্রজন্ম। 1G, 2G থেকে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সূচনা আধুনিক হয়ে 3G পেরিয়ে 4G হয়ে যায়। এখন আমরা রয়েছি 4G জামানায়। এর আগামী আধুনিকীকরণ রূপ হচ্ছে 5G। যদিও অনেক দেশেই শুরু হয়ে গেছে 5G নেটওয়ার্ক। ভারতও এই দৌড়ে সামিল হয়েছে।

টেলিকম শিল্পের সঙ্গে একজোট হচ্ছে ইন্টারনেট বা ডিজিটাল পরিষেবা। ৫টি নেটওয়ার্কের রূপরেখা তৈরির জন্য ‘৫জি ইন্ডিয়া ফোরাম’ গড়েছে সেলুলার অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (COAI)।

5G পরিষেবার স্পিডে যে কোনও HD সিনেমা মাত্র 3 সেকেন্ডে ডাউনলোড করা যাবে। একই সময় একসাথে বহু ডিভাইসকে যুক্ত করা যাবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। চালকবিহীন গাড়ি চলাচল কিংবা বাড়ির বাইরে থেকে ভিতরের বৈদ্যুতিক পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে ৫জি-তে। বিশষজ্ঞরা বলছেন, ৫জি পরিষেবায় দূরে থেকেই চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারবেন ডাক্তাররা।

কিভাবে 5G প্রযুক্তি কাজ করে? (How dose 5G works?)

5G টেকনোলজি পাঁচটি প্রযুক্তি থেকে গঠিত হয়-

  1. মিলিমিটার ওয়েভ
  2. স্পিড সেল
  3. ম্যাক্সিমাম মিমো
  4. বিমফর্মিং
  5. ফুল ডুপ্লেক্স

মিলিমিটার ওয়েভ 5G

মিলিমিটার ওয়েভ 5জি প্রচুর ডেটা অর্জন করে। যাতে প্রতি সেকেন্ডে 1GB গতিতে ডেটা স্থানান্তর করা সম্ভব করে। এই প্রযুক্তি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেরিজন এবং AT&T এর মতো টেলিকম অপারেটররা ব্যবহার করছেন।

মোবাইল কল করার সময় বা ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় মোবাইল তরঙ্গ মাধ্যম ব্যবহার করে। যখন একসঙ্গে অনেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন সিগন্যাল ড্রপ হয়ে যায়। তাই বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করছেন এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ানোর। ৫জি-তে পরীক্ষামূলকভাবে মিলিমিটার তরঙ্গ বা ৩০-৩০০ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যবহার করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্পিড সেল

5জি প্রযুক্তির দ্বিতীয় বেস হ’ল স্পিড সেল। মিলিমিটার-ওয়েভের সমস্যা যেখান থেকে শুরু হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় স্পিড সেলের কাজ। হাই ওয়েভের মিলিমিটার তরঙ্গ কোনও বাঁধা অতিক্রম করতে পারে না। যেহেতু mm তরঙ্গ বাধাগুলিতে কাজ করতে পারে না, তাই মূল সেল টাওয়ার থেকে সিগন্যাল রিলে করার জন্য পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রচুর পরিমাণে মিনি সেল টাওয়ার স্থাপন করা হয়। এই টাওয়ারগুলির মাধ্যমে দূরত্বটা এতটাই কম হয়ে যায় যে একটি টাওয়ারে সিগন্যালের সমস্যা হলে অন্য টাওয়ারের মাধ্যমে সিগন্যাল চলে আসবে।

ম্যাক্সিমাম মিমো

5G প্রযুক্তির পরবর্তী ভিত্তি হ’ল সর্বাধিক MIMO, অর্থাৎ মাল্টিপল ইনপুট এবং মাল্টিপল আউটপুট প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক পরিচালনা করতে বড় সেল টাওয়ার ব্যবহার করা হয়। 4G নেটওয়ার্ক সরবরাহকারী একটি নিয়মিত সেল টাওয়ারে 12টি অ্যান্টেনা আছে, যা সেই অঞ্চলে সেলুলার ট্রাফিক পরিচালনা করে।

MIMO 100 অ্যান্টেনাকে একসাথে সমর্থন করতে পারে যা বেশি ট্রাফিক থাকাকালীন টাওয়ারের ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এই প্রযুক্তিটির সাহায্যে এটি সহজে ৫জি সংকেত সরবরাহ করতে সহায়তা করে।

বিমফর্মিং

বিমফর্মিং এমন একটি প্রযুক্তি যা নিয়মিতভাবে একাধিক সোর্স কে নজরদারি করতে পারে এবং যখন একটি সিগন্যাল ব্লক থাকে তখন অন্য শক্তিশালী এবং উচ্চতর স্পিডের টাওয়ারে স্যুইচ করতে পারে। এটি নিশ্চিত করে যে নির্দিষ্ট ডেটা কেবল একটি নির্দিষ্ট দিকে যায় । যার কারণেই একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহকের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে যায় ।

ফুল ডুপ্লেক্স

ফুল ডুপ্লেক্স এমন একটি প্রযুক্তি যা একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে একই সাথে ডেটা প্রেরণ এবং গ্রহণ করতে সাহায্য করে। এই প্রযুক্তি ল্যান্ডলাইন টেলিফোন এবং শর্ট-ওয়েভ রেডিওতে ব্যবহৃত হয়। এটি দ্বিমুখী রাস্তার মতো, যা উভয় দিক থেকে একই ট্রাফিক প্রেরণ করে।

সকল জেনারেশনের স্পিড লিমিট

  • ৩জি এর স্পিড ২০০ কিলোবাইট থেকে ১ বা ২ মেগাবিট পর্যন্ত হতে পারে।
  • ৪জি এর স্পীড ১০০০ মেগাবিট পর্যন্ত হতে পারে।
  • ৫জি এর স্পীড ১০০০০ মেগাবিট থেকে ১.৯ গিগাবিট পর্যন্ত হতে পারে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ৪জি যুগে প্রবেশ করলেও ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই উচ্চ গতিশীল নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ গ্রাহক।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীর মাত্র ৬ শতাংশ পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) ইন্টারনেট সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছে বৈশ্বিক মোবাইল কমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রি জিএসএম অ্যাসোসিয়েশন (জিএসএমএ)।

সে বছর বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মোট গ্রাহকদের যথাক্রমে ৭ ও ৬ শতাংশ ৫জি’র সেবা পাবেন। দেশে ২০২১ সালে ৫জি চালুর পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই ঘোষণা করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের সব জেলায় এই নেটওয়ার্ক পৌঁছে যাবে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ৪জি যুগে প্রবেশ করলেও ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই উচ্চ গতিশীল নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ গ্রাহক। ২০১৯ সালে দেশে মাত্র ৪০ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর কাছে স্মার্টফোন ছিল; ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ৬৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য সেই তুলনায় ভারত ও পাকিস্তানে তা দাঁড়াবে যথাক্রমে ৮৪ ও ৭০ শতাংশে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে ২০২০ সালে ৫জি সংযোগসংখ্যা পূর্ব ধারণার চেয়ে ২০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অবশ্য এ অঞ্চলের মোবাইল অপারেটরেরা- যেগুলো কি না কোনো কোনো জায়গায় দ্রুত বর্ধনশীল এবং বৈশ্বিক গ্রাহকদের মোট সংখ্যার অর্ধেক- ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের নেটওয়ার্কের পেছনে ৪১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে ৫জি নেটওয়ার্কের উন্নয়নে, বলেছে জিএসএমএ।

৫জি’র সুবিধা-অসুবিধা

আগে আমরা ১জি ব্যবহার করতাম। তারপর আস্তে আস্তে সময় অতিক্রম এর সাথে সাথে আরেকটি জেনারেশন আসলো- ২জি। এই ২জি এর স্পীড ১জি’র থেকে বেশি। ঠিক এভাবে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে ২জি থেকে ৩জি আসলো, তারপর আসলো ৪জি। প্রতিটি জেনারেশনের স্পিড আগের জেনারেশন থেকে বেশি ছিল।

বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বেশি যেটি প্রচলিত, সেটি হচ্ছে ৪জি। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে এই ৪জি থেকেও আরো অধিকতর স্পিড নিয়ে বাজারে আসতে চলেছে ফাইভ-জি। তবে মনে করা হয় যে, এই ফাইভ-জি ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুব বেশি হবে না।

৫জি / 5th জেনারেশন এর সুবিধা

সুবিধা ছাড়া তো আর নেটওয়ার্ক এর দুনিয়ার এক যুগ স্থানান্তর সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই সুবিধা রয়েছে।

  • যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে নিম্ন ১০০এমবি থেকে ১ জিবি/সেঃ পর্যন্ত ৫জি স্পীড পাওয়া যায়। যেখানে ৪জি তে ১ থেকে ৮০ এম্বি/সেঃ স্পীড পাওয়া যেত।
  • বাংলাদেশে সঠিকভাবে ক্ষেত্র গড়ে উঠলে নিয়মিত ৪০এমবি/সেঃ এর উপরে স্পীড থাকবে।
  • যেহেতু আগের ফোনগুলোতে 5জি ব্যবহার করা সম্ভব নয় সেহেতু সম্পূর্ণভাবেই নতুন সব ৫জি এবং উচ্চমানের কম্পিউটার এবং ফোন ব্যবহার করতেই হবে। সেক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির প্রসার আরও অনেকটাই বাড়বে।

এবার বলি দু-একটা অসুবিধা কথা

আপনি হয়তো খেয়াল করবেন গত ৭-৮বছরে দেশে এই ৩জি আসার পর বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমনঃ আগে নানারকম পাখি যেমন চড়ুই, টুনটুনি, বাবুই আরও অনেক পাখি যেগুলোর ইলেকট্রনিক রেডিয়েশন ধারণ ক্ষমতা কম সেগুলো বীলিন হয়ে গেছে। চারপাশ টা দেখলে এখন পাখিগুলো আর কোথাও খুঁজে পাবেন না৷ সম্প্রতি ২০১৮ তে প্রথম ৫জি টেস্ট চালায় জার্মানীর একটি সংস্থা। সেখানে জরিপ অনুযায়ী ৫দিনে এলাকার চারদিকে ১০ কিলোমিটার জুড়ে বেশ কিছু পাখি মারা যায় খুব অল্প দিনেই।

গত ১০ বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত মৃত্যুর হার অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এটাও ইলেকট্রনিক রেডিয়েশন এর অন্যতম কারণ।

এখনই কোন কোন এলাকায় ৫জি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে

চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, নিউইয়র্ক, আলাস্কা, ক্যালিফোর্নিয়া সহ আরোও বেশ কয়েকটি শহরে এবং যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বেশ কিছু শহরে।

এর মধ্যে এপ্রিল ২০১৯ সালে প্রথম One Plus 7 Pro ফোনটির মাধ্যমে প্রথম ৫জি ব্যবহার করে দেখা হয় এবং ফলাফল হলো ১.৩৫ জিবি/সেঃ। এর পর যুক্তরাজ্যে ঠিক একই ফোনের মাধ্যমেই প্রথম ৫ জি ব্যবহার করা হয়। যেখানে নেটওয়ার্ক স্পীড ছিলো ৩০০ থেকে ৫০০ এমবি/ সেঃ। এরপর কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট করা শেষে স্পীড পাওয়া গেছে ২৫০-৪০০ এমবি/সেঃ। নিশ্চয়ই একটা স্পীডের তারতম্য দেখতে পাচ্ছেন তাই না?

এই তারতম্যের একমাত্র কারণ হলো জায়গা এবং প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্টস এর অভাব। এখনো ৫জি ভিত্তিক নেটওয়ার্ক এর ক্ষেত্র তৈরি হয়নি ।

এখন একটু নিম্নোক্ত ফোনগুলোর দিকে নজর দিন

Samsung Galaxy S10 5G, Oppo Reno 5G, OnePlus 7 Pro 5G, OnePlus Nord N10 5G, Xiaomi Mi Mix 3 5G, Huawei Mate 20 X 5G, and the LG V50 ThinQ 5G.

সারা বিশ্বে এখন পর্যন্ত এই ফোনগুলোতেই শুধুমাত্র ৫জি ইন্টারফেইস তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু খুব কম ব্যবহারকারীই এখনো ৫জির সুবিধা পেয়েছেন।

লিখেছেন – তাহিয়া খান প্রভা

If you like this post; please share it

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *