অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফল

একবিংশ শতাব্দীতে এসে মোবাইল ফোন আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন নেই এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মোবাইল ফোনের সাম্প্রতিক এই সহজলভ্যতা হয়তো অনেকের জন্যই তেমন কোনো সমস্যার বিষয় নয়। তবে সবকিছুরই ভালো এবং খারাপ দুইটি দিক আছে। মোবাইল ফোনও তার ব্যতিক্রম নয়। আজকের আলোচনায় অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফল সমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।


মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতায় অনেক অনেক সমস্যার সুন্দর সমাধান হয়েছে সত্য, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারে আবার নতুন কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তৈরি হয় আসক্তি। এই আসক্তির রয়েছে নানা কুফল।

অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফল বা ফলাফল

মোবাইল ফোন একটি দরকারি বস্তু- এতে কোনো সন্দেহ নেই। আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ কিংবা বিনোদন আর শিক্ষা- সবকিছুতেই মোবাইল ফোনের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফলগুলোকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। এর মধ্যে প্রধান কিছু কুফল নিচে তুলে ধরা হল:

১. মানসিক চাপ ও ডিপ্রেশন

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে মানসিক চাপ ও ডিপ্রেশনের হার বেশি। বর্তমানে তরুণদের একটা বড় অংশ ইন্টারনেটে তথা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন।

এসব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষজন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোই শেয়ার করে থাকেন। অন্যদের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোর পোস্ট দেখে কারো মনে হতেই পারে যে তার জীবনে সুন্দর কিছু নেই। মনে হতে পারে বাকি সবাই অনেক মজা করছে, বাকি সবার জীবন বুঝি অনেক সুন্দর।

এই ধরনের চিন্তা মানুষকে হতাশা, মানসিক চাপের দিকে ধাবিত করে। ফলে অবনতি হয় মানসিক স্বাস্থ্যের।

২. শারীরিক সমস্যা

মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে হতে পারে নানা শারিরীক সমস্যা। মাথা নিচু করে মোবাইল ব্যবহারে হাত, ঘাড় ও মেরুদণ্ড অস্বাভাবিক অবস্থানে চলে যায়। যার ফলে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে স্থায়ীভাবে ব্যথা ও হাড়ের নানা সমস্যা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের স্থায়ীভাবে এধরনের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ সমস্যা এড়াতে ফোন ব্যবহার করার সময় বুকের কাছে না ধরে মুখের সোজাসুজি ঠিক সামনে ফোন ধরা উচিৎ।

৩. ঘুমের স্বল্পতা

বেশিরভাগ মানুষ ঘুমানোর পূর্বে বিছানায় শুয়ে অন্ততঃ ঘণ্টাখানেক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকেন। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের আর্টিফিশিয়াল নীল আলো ঘুমের জন্য সহায়ক হরমোনগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। যার ফলে সহজে ঘুম পায় না।

আবার বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল ফোন বালিশের পাশেই রাখেন, ফলে ঘুমে থাকা অবস্থায় কোনো কল বা এসএমএস চলে এলেও ঘুম ভেঙে যায়, ফলে ঘুমের স্বল্পতা তৈরি হয়। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে ঘুমানোর পূর্বে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস পরিহার করা উচিৎ এবং মাথার পাশেই ফোন না রেখে দূরে কোথাও রাখা উচিৎ।

আরও পড়ুন-

৪. দুর্ঘটনা

ড্রাইভিংয়ের সময়ে মোবাইল ব্যবহারের ফলে দুর্ঘটনার উদাহরণ অসংখ্য। গাড়ি চালানোর সময় অনেকেই ফোন ব্যবহার কর থাকেন, অনেক মোটরবাইক চালকও একই কাজ করে থাকেন।

এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অভ্যাস। গাড়ি বা যেকোনো যানবাহন চালানো এমন একটি কাজ যাতে নিবিড়ভাবে মনোযোগ দিতে হয়। একটু হেরফের ঘটলেই মারাত্মক জীবনঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এসব দুর্ঘটনার ভিকটিম বা আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু চালক নিজেই নন, কোনো পথচারী কিংবা অন্য কোনো প্রাণিও হতে পারে। তাই গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার একদমই বন্ধ রাখা উচিৎ।

শুধু চালকই নয়, পথচারীদের কারণেও এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাস্তা পারাপারের সময় ফোন ব্যবহারের ফলে দুর্ঘটনা কিংবা ফোনের দিকে তাকিয়ে হাঁটার সময় গর্তে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

৫. শঙ্কা

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনা’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করেন তাদের ব্যক্তিক ও সামাজিক শঙ্কায় ভোগার প্রবণতা অনেক বেশি।

সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে মানুষের মধ্যে ফোন ব্যবহারের হার বেড়েছে। যার ফলে শঙ্কায় ভোগার প্রবণতাও বেড়েছে।

৬. ক্যানসারের ঝুঁকি

যদিও অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্যানসার হওয়ার সরাসরি উদাহরণ নেই, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে যে যারা অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করেন তাদের ক্যানসারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ আকারে রেডিয়েশন নির্গত হয় যা ক্যানসারের ঝুঁকি কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দেয়।

সাধারণত চীনা মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর তৈরিকৃত ফোনগুলো থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি রেডিয়েশন নির্গত হয়।

৭. শারীরিক স্থূলতা

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা বেশি সময় ফোন ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে স্থূলতা বা মেদ জমে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ফোন ব্যবহারকারীদের স্থূলতার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় ৪৩% বেশি, যা একরকম আশঙ্কাজনকভাবেই বেশি বলা চলে।

৮. দৃষ্টি সমস্যা

খুব ছোট আকারের ফন্ট ব্যবহার করে ফোন ব্যবহার করলে চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা, চোখ শুষ্ক অনুভব করা- ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা থেকে মাথাব্যথা হতে পারে।

এ জাতীয় সমস্যা এড়াতে চোখ তথা মুখমণ্ডল থেকে কমপক্ষে ১৬ ইঞ্চি দূরে ফোন রাখা উচিৎ। এবং স্বাচ্ছন্দ্যে পড়া যায় এমন আকারের ফন্ট রাখা চোখের জন্য ভালো।

একটানা অনেকক্ষণ ফোন ব্যবহার পরিহার করা উচিৎ। স্বাভাবিকভাবে চোখের পলক ফেলা এবং কিছুক্ষণ পরপর ফোন রেখে চোখ দিয়ে দূরের বস্তু দেখলে এধরনের সমস্যা থেকে অনেকটাই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

৯. আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি

বর্তমানে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

আমেরিকার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে যে, যারা পাঁচ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ফোন ব্যবহার করেছে তাদের মধ্যে অন্তত ৪৮% একবার হলেও আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছে বা পরিকল্পনা করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এই প্রবণতাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় বলে মতামত বিশেষজ্ঞদের। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নানা বিষয় তরুণদের মধ্যে ডিপ্রেশন, শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে ডিপ্রেশনের জন্য আত্মহত্যা ইদানীং অনেক বেশি হারে বেড়ে গেছে।

১০. মনোযোগে ঘাটতি

বর্তমানের তরুণ বয়সীদের অন্যতম বড় একটা সমস্যা হচ্ছে অ্যাটেনশন স্প্যান বা মনোযোগের সময়সীমা অনেক কম। অধিকাংশ তরুণই একটানা বেশ কিছুক্ষণ কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না।

মোবাইল ফোন জনপ্রিয় হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ২০০০ সালের শুরুর দিকে একজন মানুষের গড় মনোযোগের গড় সময়সীমা ছিল ১২ সেকেন্ড।

মাইক্রোসফট পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মোবাইল ফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা এক-তৃতীয়াংশ কমে এখন মাত্র ৮ সেকেন্ড হয়েছে।

যার ফলে মানুষের কর্মদক্ষতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মোবাইল ফোনের ব্যবহারে লাগাম টানা অত্যন্ত জরুরি।

— শেষ কথা —

মোবাইল ফোন নিঃসন্দেহে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম আশীর্বাদগুলোর একটি। পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নেওয়ার যে আরাধ্য স্বপ্ন, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে স্মার্টফোন।

যেকোনো ভালো জিনিসেরই কিছু খারাপ দিকও থাকেই। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে যে সমস্যাগুলো হয় সেগুলো থেকে এড়িয়ে থাকার জন্য চেষ্টাটাও আমাদেরই করতে হবে।

মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চাকচিক্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে আমরা ভুলে গেছি বাইরের দুনিয়ার সৌন্দর্যকে। নিজেদের দিকে ডেকে এনেছি নানারকম ক্ষতি। অপকারী দিকগুলোকে এড়িয়ে উপকারী দিকগুলোর ব্যবহারই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে দেখতে পারেন-