ফয়সালের করোনা পজিটিভ (ছোট গল্প)

‘ভাইয়া, সেনানিবাস এরিয়ায় আমার অর্ডার গতকাল ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল। আজো আমি বাজার-সদাইগুলো পাইনি। আপনাদের স্বেচ্ছাসেবক ফয়সাল ভাইয়ের মোবাইল ফোনও বন্ধ …।’

‘সরি আপু। আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। যারা লক ডাউন মেনে বাসায় আছেন, তাদের বাজার-সদাই দোকানের মূল্যে ফ্রী হোম ডেলিভারির জন্য আমরা রাত-দিন কাজ করছি। আপনি অনুগ্রহ করে অর্ডারটি আবার দিন।

আপনার বাসায় মাত্র দুই ঘন্টার মধ্যে আমি বাজার পাঠিয়ে দিচ্ছি। সরি আপু, ফয়সাল কিন্তু খুব দায়িত্বশীল ছিল। ভোর ৩টা থেকে অর্ডার গুছাতো, ফজর পড়ে বাজার করে সবার বাজার দিয়ে, বিকালে ঔষধ ডেলিভারি দিতো। রাত ১২ টার আগে ও কখনো ঘুমাতো না। আপু ওর জন্যে দু’আ করবেন। ফয়সালের করোনা পজেটিভ হওয়ায় হাসপাতালে আছে।

“বিপদের সময়ে আমরা ক’জন” স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কন্ট্রোল রুমের হট লাইনে কথা বলে তানজিলার মাথাটা যেন বোর হয়ে গেলো।

ওর মনে হল আজকে সকালে ময়মনসিংহ হেল্প লাইনে একজন স্বেচ্ছাসেবীর জন্য দু’আ চাওয়া হয়েছিল। তাড়াহুড়া করে পোস্টটি পড়া হয় নি।

কন্ট্রোল রুমে কথা সেরে তানজিলা হেল্প লাইনের পোস্টটি খুঁজে বের করলো। ‘একজন স্বেচ্ছাসেবীর করোনা পজেটিভ ‘ শিরোনামের পোস্ট পড়লো তানজিলা। ফয়সালের প্রতিদিনের কর্মলিপি দেখে বিস্মিত হলো সে। শত শত কমেন্টস দেখে সে আরো অবাক হলো। একজন সাধারণ স্বেচ্ছাসেবক হয়েও ফয়সাল যেন সকলের মধ্যমণি। শত শত কমেন্টস-এ আবেগময় দু’আ।

তারাগাই থেকে তারিক লিখেছে, ‘লক ডাউনের জন্য আমি শহরে যেতে পারছিলাম না। রিক্সায় গেলেও প্রায় ১০০ টাকা খরচ হতো। আমার মায়ের ব্যথার ঔষধ বাসায় দিয়ে যান ফয়সাল ভাই। মাত্র ৬৫ টাকার ঔষধ ফ্রী ডেলিভারি দিতে তিনি ১৭ কি.মি. রাস্তা আপ-ডাউন করেন। পরোপকারী এই মানুষটি আমাদের মাঝে আবারো ফিরে আসুক …।’

ফয়সালের জন্য মানুষের হৃদয়ের গহীনের দু’আগুলো দেখতে দেখতে তানজিলার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

মেজর সজীব ফয়সালকে খুব স্নেহ করেন। ছোট ভাইয়ের মতো আদর করেন। তিনি হাসপাতালে কল দিয়ে ফয়সালের আজকের অবস্থার খোঁজ নিলেন।

ওর অবস্থা শোচনীয়। অক্সিজেন চলছে। তবুও শ্বাসকষ্ট বেশি। তাপমাত্রা আরো  দুই ডিগ্রি বেড়েছে। ওর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। ভয়ে নার্সরা ওর রুমে যান না।

ডাক্তার ওয়াহিদুজ্জামান করোনা পজেটিভ ৩০ জন রোগীর সেবার পাশাপাশি ফয়সালকে আলাদা নজর দিচ্ছেন। সহকর্মী চিকিৎসকগণ তাকে বারবার সতর্ক করছেন।

তিনি জবাব দিলেন, ‘দেখুন ফয়সালও কিন্তু গ্লাভসসহ পিপিই পরিধান করতো। তবুও সে আজ করোনা পজেটিভ। আমিও হয়তো পজেটিভ হবো। মৃত্যু ফেরানোর ক্ষমতা কারো নেই। তারপরও সেফটি রোল মেনে যতটুকু সেবা দেয়া যায়! কিন্তু ফয়সাল তো একেবারে তরুন। সমাজে ওর মতো ছেলে দরকার। যদি হায়াত থাকে তাহলে যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে…।’

রাত ১২ টার দিকে ফয়সালের শরীর প্রচন্ড ঘেমে গেলো। ডাক্তার আজ ৪১ দিন ধরে বাসায় যান না। গোসল ও সামান্য বিশ্রামের জন্য নতুন বাসায় যান। হাসপাতালের সামনে এক রুমের আলাদা বাসা নিয়ে একা থাকেন তিনি। ডাক্তার রেডি হচ্ছেন নতুন বাসায় যাওয়ার জন্য। এমন সময়ে ফয়সালের শরীরে ঘাম দেখে তিনি ওর বেডের দিকে এগিয়ে গেলেন।

পরীক্ষা করে তিনি দেখলেন, ওর শরীরের তাপমাত্রা একেবারে স্বাভাবিক। শ্বাসকষ্টও কমে গেছে। ওর শরীর তিনি নিজেই স্পঞ্জিং করলেন। অক্সিজেনের মাস্ক খোলার সময় ফয়সালের যেন ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ডাক্তার সাহেব মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।

টানা ৭২ ঘন্টা পর চোখ মেলে তাকালো ফয়সাল। ৩ দিন, ৩ রাতের ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে ফয়সাল যেন কিছুই মনে করতে পারছে না। বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে আছে পিপিই পরিহিত ডাক্তারের দিকে। একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে ডাক্তার বললেন, ‘ফয়সাল। তুমি খুব ভাগ্যবান। তোমার সামান্য সমস্যা হয়েছিল। তাই আমরা তোমার একটু সেবা করলাম। এখন তুমি সুস্থ।’

ওকে সাহস যোগাতে কথাটি ডাক্তার বললেন। পরক্ষণেই তিনি মনে মনে বললেন, ‘আল্লাহ যেন এবারের পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ করে দেন।’

ফয়সাল জিজ্ঞেস করল, ‘ আ-প-না-র না-ম জা-ন-তে পা-রি স্যা-র?’

সামান্য বাক্যটি বলতে গিয়ে ওর অনেক কষ্ট হলো। বিধস্ত দেহে যেন ঠিকমতো কথা বের হয় না।

আমি ওয়াহিদুজ্জামান। ইনশা আল্লাহ বাকী কথা কাল সকালে হবে। এখন তুমি একটু বিশ্রাম করো।

আরো ঘন্টা খানেক ওকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে ডাক্তার সাহেব বাসায় গেলেন। ওর শারীরিক অবস্থার উন্নতি দেখে দু’জন নার্স রাতের ডিউটি করতে রাজি হলেন। ওর কাঁচের রুমের বাইরে থেকে তারা সারা রাত পর্যবেক্ষণ করলেন।

ফয়সাল বেশ কয়েক বার বেডে উঠে বসার চেষ্টা করেছে। কয়েক বার ঘুমিয়েছে।

আজ ২২ এপ্রিল ২০২০। ভোর থেকেই নীলিমা যেন নির্মল আলোক নিয়ে পসরা সাজিয়েছে। সকাল ৮টায় ডাক্তার ওয়াহিদুজ্জামান ওয়ার্ডেে এসেই প্রথমে ফয়সালকে চেক আপ করলেন। কিছু ঔষধ খাইয়ে তিনি নিজের রুমে গিয়ে নামাজ পড়লেন। অবশ্য তিনি এই ৪০ দিন ধরে সর্বদা অযু অবস্থায় থাকছেন। মনে মনে যিকির করছেন।

পরিচালক মহোদয়কে ফোনে ইনফর্ম করা মাত্রই ওর স্যাম্পল দ্বিতীয় বারের মতো নেয়া হল। নমুনা সংগ্রহের পর পরই ফোনে মেয়র মহোদয়, ডিসি সাহেব ওর সংবাদ নিলেন।

মেজর সজীব সরাসরি পরিচালক মহোদয়ের রুমে চলে এলেন।

‘স্যার, এখন তো ফয়সালের অবস্থা অনেকটা উন্নতির দিকে। হয়তো আজকের দিন পার হলে আরো উন্নতি হবে। আমি চাচ্ছি আমার নতুন বাসাটা টোটালি খালি। সেখানে দুই জন ওর পরিচর্যা করবে। আপনাদের সব  নিয়ম আমি মেনে চলবো।’

‘দেখো মেজর সজীব! এটা সিরিয়াস কেস। তাছাড়া…।’ পরিচালক মহোদয় কথা শেষ করলেন না।

‘স্যার, আমি সব নিয়ম মেনে কাজটি করতে চাচ্ছি। ওকে বাসার পরিবেশে নিয়ে গেলে আরো দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।’

মেয়র মহোদয়, ডিসি সাহেব, সিভিল সার্জন সাহেবের সাথে ফোনে কথা বলার পর ফাইল রেডি হতে ত্রিশ মিনিট লাগলো।

ডাক্তার ওয়াহিদুজ্জামান মেজরকে সব বুঝিয়ে দিলেন। ফয়সাল মেজর সজীবকে দেখে অঝোর ধারায় অশ্রুপাত করতে লাগলো। মেজর ওর বাহুতে শক্ত করে ধরলেন। গাড়ি পর্যন্ত যাওয়াটা ওর সহজ হলো।

অল্প সময়ের মধ্যে ওরা চর জেলখানায় নতুন বাসায় পৌঁছলো। বাসার গেটের পর থেকে বিশাল লন জুড়ে ফুলের বাগান। বাউন্ডারির ভেতরে দেশী-বিদেশী নানা জাতে ফল আর ঔষধী গাছ। মূল বাসভবন সাদা দু’তলা। নদীর তীর ঘেঁষে সুন্দর, ছিমছাম একটি বাড়ি।

‘ভাইয়া, আমার করোনা পজেটিভ। আপনি কেন শুধু আমাকে আপনার বাসায় নিয়ে আসলেন?’

ওর কথা শুনে যে কারো আখিঁ যুগল অশ্রুসিক্ত হবে। মেজর তো ঐরকম ধাতুতে গড়া না। তিনি কড়াভাবে বললেন, ‘হাসপাতাল তো ভালই ছিলো। ভাই হিসেবে কি আমি কিছুই তোমার জন্যে করতে পারি না?’

ফয়সাল আর কথা বাড়ায় না।

দেখতে দেখতে ১৪ দিন পার হয়ে  গেলো। দ্বিতীয় বারের মতো তৃতীয় টেস্টের রিপোর্টও কভিড-১৯ নেগেটিভ আসলো ওর। সিভিল সার্জন অফিস থেকে ফয়সালকে এবার নভেল করোনা মুক্ত ঘোষণা করা হলো।

গল্পকার- ডাঃ মোঃ আবু সাঈদ সরকার

আরও পড়ুন-

Leave a Comment